গ্রামীণ জনপদের ঘর বাড়ি_ঘর-৬ (২য় পর্ব)

[লেখকঃ স্থপতি মাহফুজুল হক জগলুল, প্রধান স্থপতি, ইন্টারডেক সিস্টেমস, ঢাকা]

গ্রামীণ জনপদের ঘর বাড়ি_ঘর-৬ (২য় পর্ব)

একটা মোটামুটি টিপিক্যাল গ্রামের
নিম্ন মধ্যম ও মধ্যম স্তরের গৃহস্থের
ঘরের কাঠামো ও নির্মাণ কৌশল:
পিরোজপুর

নিম্নবিত্তরা সাধারনত কমদামের ‘রেন্ডি কড়ই’ বা রেইন ট্রি কাঠ ব্যবহার করে, যারা আরো গরীব তারা সস্তা চম্বল কাঠ ব্যবহার করে। যারা ধনবান তারা পাকা রেন্ডি বা কেউ কেউ লোহা কাঠ ব্যববহার করে। বর্তমান বাজার দরে কাঠের দাম মোটামুটি:

সাধারন রেন্ডি , ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ঘন ফুট

ভাল পাকা রেন্ডি, ৭৫০ থেকে ১০০০ টাকা ঘন ফুট

সাধারন চম্বল, ২০০ থেকে ৩০০ টাকা ঘন ফুট

লোহা কাঠ, ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা ঘন ফুট (বর্তমানে মনে হয় দেশী লোহা কাঠ আর পাওয়া যায় না, নাইজেরিয়ান কিছু লোহা কাঠ বাজারে পাওয়া যায়)

ফ্রেমের কাজ শেষ হবার পর ‘মেটে তেল’ নামক এক প্রকার তেল কাঠের উপর ভালোভাবে লাগিয়ে দেয়া হয়, এতে নাকি কাঠ ঘুণে ধরে না। ইদানীং মেটে তেলের সাথে ডিজেল মিশেয়ে মাখানোর চলন শুরু হয়েছে। মেটে তেল আসলে কি ধরনের তেল সে সম্মন্ধে আমার তেমন ধারনা নাই।

কাঠের খুটির সাইজ হয় সাধারণত, ৩”x৩.৫” থেকে ৪”x৪.৫”। চালের ফ্রেমের ( স্থানীয় ভাষায় মাটাম) সাইজ হয় ২”x২.৫” থেকে ৩”x৩.৫”। খুটি গুলো সাধারন্ত ৪ থেকে ৬ ফিট পর পর বসানো হয়।চার কোনার খুটিগুলো একটু সাইজে বড় আর শক্ত কাঠের হতে পারে। খুটি গুলি মাটি স্পর্শ করেনা, খুটিগুলো বসানো হয় ৮”/৯” বৃত্তাকার ২” পুরু পোড়ামাটির ‘পাটা’ এর উপর, এটা করা হয় যেন কাঠের খুটি মাটির সংস্পর্শে এসে নষ্ট হয়ে না যায়। একটা পাটার দাম মোটামুটি ১৫/২০ টাকা। স্থানীয় কুমারেরা পোড়ামাটির এই পাটা তৈরি করে।

একটি ১৭ বন্দো ঘরে ১৩ থেকে ১৫ কে জি লোহার পেরেক বা অন্যান্য হার্ডওয়ার লাগে। ১৯ বন্দো ঘরে ১৭ থেকে ১৮ কে জি লোহার হার্ডওয়ার লাগে। প্রতি কেজি লোহার হার্ডয়ারের দাম বর্তমান বাজার মূল্যে আনুমানিক ২২০ টাকা। বড় গজাল পেরেক ৪”,৬” বা ৮” পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।১৭ বন্দো একটা ঘরের কাঠ মিস্ত্রি খরচ ২৫০০০ টাকার মতো, ১৯ বন্দে তা বেড়ে ৩০০০০ থেকে ৩৫০০০ পর্যন্ত হতে পারে।

ঘরে শীর্ষের উচ্চতা সাধারণত হয় ১০ থেকে ১৪ হাত, অর্থাৎ ১৫’ থেকে ২১’ ত্যে থাকে। উচু ঘরের ক্ষেত্রে একটা কাঠের দোতলা ফ্লোর থাকে, এটাকে বলা হয় ‘আফার’ বা ‘পাটাতন’, এখানে নারিকেল, সুপারি,ধান,চাল, খেজুরের গুড় সহ সংসারের নানা রকম জিনিস রাখা হয়, এখানে অনেকে ঘুমায়ও। এই পাটাতন থাকায় টিনে চালের তাপ অনেক কম আসে নিচের তলায়।

বেশির ভাগ ঘরই চৌচালা, তবে অনেকেরই সামনের বৈঠকখানার অংশে একটু নিচু আলাদা চাল থাকে। বৈঠখানার প্লিন্থও মধ্যের প্রধান ঘরের চেয়ে ৬ থেকে ৮ ইঞ্ছি নিচু হয়ে থাকে, এতে মাটি কম লাগে আর দুইটা স্পেসের ফ্লোরের মধ্যে একটা লেভেল চেইঞ্জের মজা থাকে। পিছনের অংশও এরকম কিছুটা নিচু। গরীবরা সাধারণত জানালায় কোন গ্রিল জাতীয় কিছুই ব্যবহার করেনা,শুধু রাতে জানালা আটকানোর জন্য কপাট থাকে। যারা একটু অবস্থা সম্পন্ন তারা জানালায় পাকা রেন্ডি বা তাল কাঠের খাড়া গরাদের মতো গ্রিল ব্যবহার করে।

রান্নাঘর (স্থানীয় ভাষায় বলে ওসশা ঘর) থাকে প্রাধান ঘর থেকে একটু আলগা, চারদিক বা তিন দিক খোলা একটা ছোট্ট ঘর সেখানে মাটির কয়েকটি চুলা থকে আর রান্নাঘরের চালের নিচে কিছু কাঠের ফ্রেম দিয়ে একটা ফলস সিলিংয়ের মতো কাঠামো (স্থানীয় ভাষায় বলে আরিমাইত্তা) করে তাতে বছরের প্রয়োজনীয় জ্বালানী কাঠ রেখে দেয়া হয়। অবস্থা সম্পন্ন গৃ্হস্থদের রান্নার জ্বালানি কাঠ ( স্থানীয় ভাষায় বলে দাউর) রাখার জন্য আলদা আলো বাতাস খোলা ‘দাউরের গোলা ঘর’ থাকে যেন ‘দাউর’ বৃষ্টিতে না ভেজে কিন্তু একই সাথে আলো বাতাসের কারনে শুকনা আর কড়কড়ে থাকে। আশ্বিন মাস থেকে চৈত্র মাসের মাঝের সময়টা বড় বড় গাছের ডাল কাটা হয় সারা বছরের রান্নার ‘দাউর’ সংগ্রহের জন্য কেননা এই সময়টা কাঠ শুকানোর জন্য অনুকুল আবহাওয়া থাকে। এতে গাছের তেমন কোন ক্ষতি হয় না, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই গাছ আবার ডালপালা পুস্পপল্লবে ভরে যায়, এটাই আমাদের দেশের প্রকৃতির জাদু। এ ছাড়াও রান্নার জন্য গাছের পাতা, নারিকেল সুপারির ‘বাইল’ ব্যবহৃত হয়।রান্নাঘর ছাড়াও তার বাইরে খোলা আকাশের নিচে কয়েকটা চুলা থাকে, বৃস্টিহীন দিনে এখানে রান্না করতে বেশি আরাম কেননা খোলামেলা এবং ধোঁয়া সহজে উড়ে যেতে পারে, খোলা চুলায় রান্নার স্বাদও ভিন্ন। আগের দিনে প্রত্যেকটি রান্নাঘরের সাথে ঢেঁকি বসানো থাকতো অথবা ঢেঁকির জন্য থাকতো আলাদা ‘ঢেঁকি ঘর’, এখন আর ঢেঁকির ব্যবহার নাই তাই তালে তালে ঢেঁকিতে পাড় দেবার সেই ছন্দময় গানও আর শোনা যায় না।

এখানে ব্যবহৃত শেষ ৯টি ছবি ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে তোলা।

যাদের গবাদি পশু থাকে তাদের গরুর মহিষের জন্য পিছনের উঠানে আলাদা গোয়াল ঘর থেকে। গ্রামে অনেকেই কবুতর পালে,অনেকের শত শত কবুতর আছে, কবুতরের ঘরগুলো এইসব ঘরের উপরের দিকে এমন ভাবে বানানো হয় যেন মনে হয় ওরাও এই ঘরেরই সদস্য, ওদের ঘরগুলো এই ঘরেরই অংশ। পাখপাখালির সাথে গ্রামীন ঘরগুলো সুন্দর ভাবে সহাবস্থান করে, দুইয়ের বসবাস যেন একাকার হয়ে যায় যেটা শহরে ঠিক উল্টা, শহরের ঘরবাড়ি পাখিদের দূরে সরিয়ে দেয়,তাদের ভয় দেখায়।

কোন কোন অতি সম্ভ্রান্ত বাড়িতে ‘দাই ঘর’ বা ‘আঁতুড় ঘর’ নামে সন্তান প্রসবের জন্য আলাদা একটা ঘর থাকতো উঠানের এক কোনায়। সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীর হাসপাতালে সন্তান প্রসব সামাজিক ভাবে খুব অসন্মাঞ্জনক বলে মনে করা হতো। কত অনাগত সন্তানের মৃত্যু ও অসহায় নারীর প্রসব বেদনা ও কোন কোন ক্ষেত্রে তার অকাল মৃত্যুর সাক্ষী ছিল কুসংস্কার ও মিথ্যা অহঙ্কারের প্রতীক এই ‘দাই ঘর’ গুলো।

তাই একটি জনপদের একটি ঘর শুধু একটি ঘর নয় এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ঐ জনগোষ্ঠীর যুগ যুগান্তরের সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক জীবনাচরণের সংগ্রাম, সৃষ্টিশীলতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং একই সাথে তার সামাজিক শোষন, পাপ ও অন্যায়ের প্রতিফলন ও তার বিবর্তনের বর্ণময় ইতিহাস। কখনো অহংকারের ,কখনো কলংকের এই সুদীর্ঘ বিবর্তনকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে চাইলে শুধু পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা থাকলেই হবেনা এর সাথে চাই নিঃস্বার্থ ও সৎ মানবিক আবেগ।


***
( গ্রামীন জীবনে ঘর বলতে বুঝায় শুধুমাত্র থাকার আবাসনটিকে……এক বংশের ১০/১৫ টি ঘর একটি উঠানের চতুর্দিকে যুগ যুগ বা শতাব্দী ধরে গড়ে উঠে তৈরি করে একটি বাড়ি……তাদের কাছে ঘর একটা নিছক কাঠামো কিন্তু বাড়ি হলো তার বংশ পরাম্পরার সামজিক পরিচয় ও যৌথ জীবনের সন্মান ও ঐতিহ্যের প্রতিক……বাড়ি তার কাছে অনেক অনেক বড় কিছু। গ্রামীন ঘরবাড়ির অন্যতম প্রধান বিষয় হলো এর ঘরের সামনের যৌথ উঠান, এই উঠানই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নিয়ন্ত্রন করে একটি বাড়ির মানুষদের জীবনের অনেক কিছু। কেউ চাক বা নাচাক উঠান অতিক্রম করেই তাকে নিজ ঘরে ঢুকতে হবে। এই উঠান হলো এই বাড়ির ভাল-খারাপ,সৎ-অসৎ, ঝগড়া-বিবাদ, প্রেম-বিরহ সহ নানা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার শতত টগবগে ‘মেল্টিং পট’, তাই কেউ চাইলেই এখানে আমাদের শহরের দেয়াল ঘেরা একাকিত্বময় বিচ্ছিন্ন জীবনের মতো নিজেকে একটা বিষণ্ণ ও অসুস্থ গুটিয়ে নেয়া ‘আইল্যান্ড’ বানিয়ে নিতে পারবেনা, এই উঠান তাকে জোর করে হলেও যৌথ জীবনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সাথে সর্বদা প্রানবন্তভাবে যুক্ত রেখে নিজেকে সব সময় সামাজিক ও প্রাসঙ্গিক করে রাখবে । ঘরের পিছনের দিকেও একটা আলাদা নিজস্ব উঠান থাকে। রান্নাঘর, দাইঘর, দাউরের গোলা, গোয়ালঘর, গোসলখানা, শৌচাগার, পুকুরঘাট সবই এই পিছনের নিজস্ব উঠানকে কেন্দ্র করে অবস্থান করে।উঠান অনেক বিশাল একটা সাবজেক্ট। এছাড়াও ঘরের কারুকাজ ও গোসলখানা ও বিশেষত শৌচাগারসহ এই চারটি বিষয় নিয়ে পৃথক ও বিস্তৃত আলোচনা পরে করার ইচ্ছা আছে যদি সকলের আগ্রহ থাকে। ইনশাআল্লাহ …….. )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *