কমলাপুর রেল স্টশন

কমলাপুর স্টেশন নিয়ে কিছু কথা

কমলাপুর স্টেশন নিয়ে কিছু কথা

[Nazifa Tabassum Puly, In-House Architect, Police Head Quarter, Dhaka]

কমলাপুর স্টেশন নিয়ে অল্প বিস্তর জেনে কিছু কথা লিখছি।।
কমলাপুর রেইলওয়ে স্টেশনের দুইজন স্থপতির একজন হলেন Daniel C. Dunhamএবং Robert Boughey। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ এর দশককে আয়ুব খান সামরিক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের দশক বলে প্রচার করেন এবং তৎকালীন ঢাকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার নিয়ে কিছু কাজ সেই সময়েই শুরু হয়। বাংলাদেশে মুঘল বা ব্রিটিশ পরবর্তী স্থাপত্যের সূচনাকাল তাই সেইসময়েই। আধুনিক স্থাপত্যের মধ্যে সেই সময়ে রিচার্ড ভ্রুম্যানের বুয়েট স্থাপত্য ভবন, কমলাপুর রেইলওয়ে স্টেশন, লুই কানের সংসদ ভবন ইত্যাদি ঢাকাকে ঢাকার নিজস্ব পরিচয় দিয়েছে। “আইকনিক” ভবন বলতে এমনসব ভবনকে বোঝানো হয় যা কেবল একটা এলাকা নয় পুরো একটা শহরের আইডেনটিটি বা পরিচয় দেয়। যেমন অপেরা হাউজ দেখলেই আপনি সিডনী শহরকে এর সাথে জুড়ে দিবেন তেমন ছাতার মত স্ট্রাকচারের কমলাপুর স্টেশন দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন ঢাকায় চলে এসেছেন। উন্নয়নের জোয়ারের সাথে সাথে যদি শহরের পরিচয়টুকুও আপনি ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চান তবে সেটা কতটা ক্ষতিকর তা ভেবে দেখাও কিন্তু আমাদের দায়িত্ব।।

প্রেক্ষাপটঃ

ঔপনিবেশিক সময়ে ঢাকার সাথে ভারতবর্ষের স্থলপথে যোগাযোগ মাধ্যম ছিল বেশ সীমিত। পশ্চিম ভারতের সাথে মানচিত্রের পূর্ব-পশ্চিম বরাবর পরিবহন চলত ফুলবাড়িয়া স্টেশন দিয়ে। পাকিস্তানের জন্মের পরে যোগাযোগ ব্যাবস্থে শক্ত করার জন্য রাজধানীর সাথে উত্তর-দক্ষিন বরাবর পরিবহন জোড়দার করতে কমলাপুর রেইলওয়ে স্টেশন নির্মানের সিদ্ধান্ত হয়। পূর্ব বাংলার এই স্টেশনটি মূলত বাংলার মানুষকে দেওয়া আয়ুব সরকারের ঘুষ স্বরূপ। এরপর বার্জার কন্সট্রাকশন কাজটা হাতে পাওয়ার পরে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক ডেনিয়েল ডানহেম নকশার কাজ শুরু করেন। (১ম ছবিতেঃ মাস্টার প্ল্যান দেখানো)। প্রথম খসড়ার মন্তব্য ও সংশোধনের পরে ডানহেমকে চলে যেতে হয় এবং কাজটি হস্তান্তর হয় বুয়েটেরই অন্য আর একজন প্রফেসর রবার্ট বাউইর কাছে। তিনি ডানহেমের মূল ধারণার উপরে কাজ করেই চুড়ান্ত নকশা তৈরী করেন।।

নকশার মূল ধারণাঃ

তখনকার সময়ে স্থাপত্যে গুরত্বপূর্ন দিক ছিল মেটাফোর বা রূপক। মুসলিম দেশে তৈরী হবার কারণে মডার্ন স্থাপত্যে মুসলিম মটিফের প্রয়োজনীয়তার কথা সরকার পক্ষ থেকে উল্লেখ ছিল। মূলত যেই শেল স্ট্রাকচার আমরা স্টেশনে দেখি তা পাশাপাশি সাজালে দেখতে অনেকটা মুসলিম আর্চের মত দেখায় (২য়, ৩য় ছবিতে)। স্থপতিবৃন্দ এই সুপার স্ট্রাকচারের নাম দেন “Dome-umbrella-scheme” বা “ছাতা-গম্বুজ-পরিকল্পনা”। তৈরীর সময়কার কিছু ছবি পোস্টের সাথে দিয়ে দিচ্ছি। (৪র্থ, ৫ম)এই নকশা কেবল দৃষ্টি নন্দনই নয়, নকশায় অবাধে বাতাস চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশন আর মানুষের চলাচলের জন্য যে সার্কুলেশন তাও অত্যন্ত সুনিপুন দক্ষতায় সমাধান করা হয়েছে। তবে ক্রান্তীয় অঞ্চলে বৃষ্টির পানির সঠিক দিক নির্নয় অনেক বিদেশী স্থপতিদের জন্য সেসময়ে চ্যালেঞ্জ ছিল। তারপরও স্টেশনের প্রাত্যহিক কাজের তেমন কোন অসুবিধা ছাড়াই স্টেশনটি হয়ে উঠেছে ঢাকার পরিচায়ক একটি স্থাপত্য।।

শেষে একটি কথা না বললেই নয়। প্রফেশনাল হিসাবে আমি নিতান্তই শিশু। ছাত্র আর প্রফেশনাল জীবনে দেখে আসা আইডেনটিটি ক্রাইসিসের অনেক কারণের একটা হল নিজেদের না জানা, দেশকে না জানা, দেশের ছোটখাট সেন্টিমেন্টগুলোর সাথে নিজেকে রিলেট না করা। ডানহেম স্যারের স্ত্রী, Mary Frances Dunham যিনি একজন মিউজিশিয়ান, বাংলাদেশের জারীগান নিয়ে কাজ করার জন্য ফেলোশিপ পেয়েছেন। আমার দেশ, হোক সে দেশ তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত, ময়লা দেশ, দেশকে দেখার চোখটা আসলে সবার না হলেও কারও কারও থাকার দরকার। হেলায় ফেলায় পড়ে থাকা স্টেশনও হয়ত অন্যভাবে ভালবাসা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *