অন্তরলোক

অন্তরলোক

[লেখকঃ মনিরুজ্জামান মন্ডল, স্থপতি ও গল্পকার]

নিজেদেরকে স্বকীয়ভাবে উপলব্ধি করার জন্য অন্তরলোকের ঠিকানা খোঁজার আবশ্যকতা রয়েছে। বহুযুগের অনুশীলনে আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য আবিষ্ট করেছে আমাদের আত্মাকে তা এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈচিত্রের সাথে তাল মেলাবার অনভ্যস্ততায় প্রায়শই প্রশ্নের সম্মুখীন হয় ‘‘কোনটা আমাদের চাই” অথবা ‘কোনটা আমাদের জন্য।’

তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ স্যাটেলাইট সংস্কৃতিকে এতো জোরে ফুঁকে দিয়েছে আমাদের হৃদয়ে যে গিটারের টিউন আর একতারার টোন আলাদা করা সত্যিই কষ্টকর। মুক্ত সংস্কৃতির মানষিকতায় আমরা যেমন গিটারের টিউন শুনতে চাইব তেমনই একতারার টোনও। কিন্তু এই প্রতিযোগীতায় আত্মউপলব্ধির অভাব থাকাতে পিছিয়ে পড়ছি আমরাই প্রতিনিয়ত।

আমাদের সমকালীন চর্চার ধরন দেখে মনে হতে পারে বহুরূপী বৈচিত্রের উৎস কেবল বর্তমান সময়ে কিন্তু বহুজাতি দ্বারা শোষিত বাঙ্গালী তার সাংস্কৃতিক রূপরেখায় সংযোজন বিয়োজন করেছে প্রতি মুহুর্তে। এসবের মধ্যে প্রধান হয়ে আছে ‘মোগলাই পরোটা’ বা মুসলিম সংস্কৃতি এবং ইংরেজী ঢং মানে ‘কাটলেট’। যবনরা জাতে ওঠে কুর্তা পাগড়ী পরে আর সনাতন হিন্দুরা শরীরে চাপান কোট – পাতলুন। এখনও অনেকেই গর্ববোধ করেন এই ভেবে যে তার পূর্ব পুরুষ সুদুর পারস্য থেকে এসেছিল এই বাঙ্গাল মুলুকে। আবার কারও দাদুর দুনলা বন্দুক ও সাহেবী পাতলুন পরা ফটোগ্রাফ আছে কারণ তিনি বিলাত থেকে ব্যারিষ্টারী পড়ে এসেছিলেন। এসবের ভিড়ে বরেন্দ্র ভুমি থেকে উঠে আসা শ্যামাঙ্গ গুটিসুটি লুকিয়ে যায় এই ভেবে যে তাদের পুন্ড্রবর্ধনের সংস্কৃতি নেহায়েত ছোট লোকের।

৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময়ে বাঙ্গালী সংস্কৃতির একটা জোয়ার ফেনিয়ে ওঠে ভাষা রক্ষার তাগিদে কিন্তু আমরা যে ইস্যু নিয়ে বিচলিত তার সঠিক সুরাহা পাওয়া যায় না আমাদের অনুশীলনে। যে কোন জাতি তার ভাষা বা ভাষারীতি, সামাজিক আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, রুচি ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য জাতি থেকে আলাদা। একই ভাষায় কথা বলেও দুই বাংলার মানুষের উচ্চারণ রীতির স্বকীয়তায় আলাদা, যদিও সংস্কৃতির দিক থেকে তারা প্রায় কাছাকাছি। আবার আমরা মুসলিম হয়েও আরব্য মুসলিমদের থেকে ভিন্ন। ভৌগলিক অবস্থান, আবহাওয়া, জলবায়ু, অনেকযুগের চর্চা ও মানষিকতা এর পেছনে প্রধান কারণ।

এই যে হাজার বছরের আচরণ রীতির বিভাজন তাতো আমাদের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া ও কৃষিজনির্ভর জীবণ প্রণালীর থেকে উৎসারিত। শিল্প বিপ্লবের কারণে আমাদের জীবন প্রণালীতে যে পরিবর্তন নিয়ে আসে তাতে ধুতি লুঙ্গি বদলে হয়তো পাতলুন পরা যায় কর্মক্ষেত্রে সুবিধার জন্য কিন্তু বাড়িতে ফিরে হাফ্প্যান্ট আমাদের একদমই বেমানান। অথবা ধরুন রাতের কোন পার্টিতে কালো শার্ট পরলেন কিন্তু এই গ্রীষ্মের সকালে কালো শার্ট মাথায় ওয়েষ্টার্ন হ্যাট আবহাওয়া পরিপন্থী নয় কি? কেবলমাত্র কেতা দুরস্ত ফ্যাশনের দায়েই কি মেইনটেন করতে হবে এসব? ইংরেজী ঢং-এ বাংলা আওড়াতে হবে; আমাদের ফতুয়া-পাজামা কি পার্টির জন্য একেবারেই বেমানান?

আবার সৌদী আরব ফেরত প্রবাসী ইয়া লম্বা জামা, মাথায় পাগড়ী জবর জং সাজ আমাদের ওয়ার্ম হিউমিড ক্লাইমেট (আদ্র – উষ্ণ আবহাওয়ায় এটা কি অস্বস্তিকর বসন নয় ফ্যাশন মূলতঃ প্রকাশভঙ্গীকে রূপায়িত করে এবং সাজানোর বিষয়টি ফ্যাশন এ খুব গুরুত্বপূৃর্ণ। সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনশীলতা এর অপরিহার্য দিক। প্রচলিত অর্থে ‘ফ্যাশন’এর ব্যাপ্তি শুধুমাত্র পোশাকে সীমাবদ্ধ থাকলেও প্রকৃত পক্ষে ‘ফ্যাশন’ হল কোন পটভূমিতে সাজসজ্জা, বাকভঙ্গিমা, এমনকি সামাজিকতার প্রচলিত ‘ঢং’। কোন একটি সমাজের প্রচলিত ‘ফ্যাশন’ যখন বহুল গ্রহনযোগ্যতা পায় এবং কালের নিরীখে স্থায়ীত্বপ্রাপ্ত হয় তখন আমরা তাকে ‘স্টাইল’ বলে থাকি। মুলতঃ ‘স্টাইল’ হচ্ছে সেই পার্থক্য সূচক বিষয়, যা দিয়ে আমরা এক সংস্কৃতি থেকে আর একটি সংস্কৃতিকে আলাদা করতে পারি, আধুনিক ও উত্তর আধুনিক শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত-স্থাপত্যে এ ধরনের বেশ কিছু সংঘবদ্ধ দল এবং তাদের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য মন্ডিত ‘স্টাইল’ আমরা পেয়েছি (যেমন BAUHAUS)।

আরেকটি বিষয়ে আলোকপাত করা যাক, ‘ফ্যাশন’ এর অনেকটা সমার্থক শব্দ ‘FAD’। তবে FAD’ (উন্মাদনা) ফ্যাশনের চেয়েও উন্মাদনা সৃষ্টি করে, এবং সমাজের নীচু শ্রেনী হতে উৎপত্তি লাভ করে। ‘ফ্যাশন’ এর আরেকটি দিক হল, ফ্যাশন সামাজিক শ্রেনীভেদের পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে সূচিত করে। সমাজের এলিট বা উঁচু শ্রেনী হতে উৎপত্তি লাভ করা ‘ফ্যাশন’ যখন ধীরে ধীরে নীচুশ্রেনীতে প্রবাহিত হয়, তখন উচু শ্রেনীরা তাদের ‘নীলরক্ত’ প্রকাশার্থে উক্ত ‘ফ্যাশন’ বর্জন করে আবার নতুন ‘ফ্যাশন’ এর আবহ সৃষ্টি করে।

ঐতিহাসিক ভাবে, কোন একটি সময়ের প্রচলিত ফ্যাশন জানা সম্ভব হয়েছে সেই সময়ের শিল্প সাহিত্যের চর্চা থেকে। (যেমন: উক্ত সময়ের কোন ব্যক্তি বিশেষের ‘পোট্রেট’ থেকে)। শিল্প বিপ্লবের আগে পর্যন্ত ‘ফ্যাশন’ ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, সনাতন পদ্ধতিতে প্রাপ্ত বস্ত্র ছিল চড়াদামের, তাই ফ্যাশান ছিল অভিজাত শ্রেনীতে সীমাবদ্ধ। শিল্প বিপ্লবের পর, পোষাকের সার্বজনীন ব্যবহার শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীতে বিভিন্নন সময়ে ফ্লপ্পার, নিউলুক, টেডিবয়েজ, মডস্ প্রভৃতি ধারণা ‘ফ্যাশন’ কে আলোড়িত করে।

ফ্যাশন ব্যাপারটা এতো দ্রুত পরিবর্তনশীল যে তা বিশেষ কোন IDENTITY তৈরী করতে পারেনা কিন্তু “বাঙ্গালী শৈলী” (স্টাইল)- এর স্বাতন্ত্র আমাদের অবস্থানকে সুনির্দিষ্ট করে। মাত্র কিছুদিন আগে বাঙ্গালী তরুণদের ফ্যাশন ছিল টি শার্ট পরে সামনের দিকে ঝুকে হাটা যেটা কিনা সমসাময়িক সময়ে আমেরিকাতে প্রচলিত ছিল অথচ এর মুল আরও অতীতে-দাশ প্রা প্রচলিত থাকার সময় আমেরিকার কালো মানুষেরা পিঠে বোঝা বহন করাতে সামনে ঝুঁকে হাটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয় এই ঘৃনীত (?) কালো মানুষের অভ্যাসই পরবর্তীতে সাদা মানুষেরা না বুঝে অনুকরণ শুরু করে। কথা হচ্ছে আমেরিকার সাদা লোকেরা না হয় শীকড়হীন কিন্তু আমরাও ওদের মতো নিজেদের লেজ কাটছি কেন?

বছর খানেক আগে আমাদের এক বিদেশী বন্ধু মেইল করেছিলো যে, ‘ওমুক (নাম মনে পড়ছেনা) ডিজাইনার-এর পোশাক বর্জন করো।’ কারণ সেই ডিজাইনার এক সাক্ষাৎকার-এ বলেছে ‘‘যদি জানতাম আমার ডিজাইনড্ ড্রেস তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশগুলো ব্যবহার করছে তবে আমি ডিজাইন করতাম না। ” কারণ এতে তার ডিজাইনের অবমাননা হয়।

মসলিনের ঐতিহ্য আমরা হারিয়েছি ঠিকই কিন্তু আমাদের জামদানী, সিল্ক, খদ্দর, তাঁতের কাপড় তো ক্রমবিকাশের দাবী রাখে। ঐতিহ্যের প্রশ্নে এবং স্বকীয়তার সন্ধানে বর্তমানে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছে। কেউ কেউ উত্তর আধুনিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন হারানো অতীত। এদের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে সফল দেশের একমাত্র মডেল ‘বিবি রাসেল’- এর ভুমিকা অগ্রগন্ন। তিনি দেশীয় পোশাকের প্রতি সহানভূতিশীল থেকেই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এর আধুনিকায়ন নিয়ে; যাতে করে আমাদের সাধারণ মানুষের পোশাক সমসাময়িক ধারায় স্থান করে নিতে পারে।

সবশেষে শেখ সাদীর সেই গল্পের বাস্তবতাকেই স্বীকার করতে হচ্ছে – “ঢোলা প্যান্ট-এর সাথে ছোট্ট টাইট শার্ট পরে ঠোটের নীচে এক চিমটি দাড়ি রাখলে পশ্চিমা টুরিষ্টরাও কনফিউজড্ হতে পারেন।”


তথ্য সূত্র ঃ Thesis Report – National Institute of Fashion Technology, Ahshan Habib, KU’95