ঢাকাবাসীর জন্য DAP, একুশের শেষপ্রহরের উপহার এবং সকলের নতুন ভাবনার শুরু

ঢাকাবাসীর জন্য DAP, একুশের শেষপ্রহরের উপহার এবং সকলের নতুন ভাবনার শুরু

লেখকঃ স্থপতি কাজী গোলাম নাসির, প্রধান স্থপতি (অবঃ), স্থাপত্য অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ

এক

ঢাকা মহানগরী বসবাসযোগ্য করার নিমিত্ত ড্যাপ (DAP) বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০১৬-২০৩৫) এর প্রথম খসড়া ২০২১ এর শুরুর দিকে পেলাম । তারপর দ্বিতীয় খসড়া এলো ২০২১’র শেষ বেলায় । যে স্ট্রাকচার প্ল্যান এর ওপর ভিত্তি করে এ বিশদ পরিকল্পনা প্রণয়নের চেষ্টা করা হলো সে স্ট্রাকচার প্ল্যান কিন্তু এখনো অনুমোদিত হয়নি,হওয়ার জন্য অপেক্ষায় । অর্থাৎ একটি গলদ চিন্তার ওপর ভর করেই কিন্তু পথের চলা । এর অর্থ যে পরিকল্পনা নিয়ে আগামীর ঢাকা পরিকল্পিত হবে বলে আশা পোষণ করছি তার মূল ভিত্তি এখনো অনুমোদিত হয়নি এবং উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানের সময় ক্ষেপনে বিশদ পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে তার শুরুর জন্য নির্ধারিত সময়কাল থেকে ছয়টি বছর ইতোমধ্যে শেষ,অর্থাৎ এ পরিকল্পনা আগামী ২০ বছর এর জন্য নয়,১৪ বছরের জন্য । DAP 2016-35 ড্যাপের খসড়া প্রস্তাবনা নিয়ে উপদেষ্টারা আলোচনা করেন, আলোচনা খুব বেশি আশাব্যঞ্জক, শুনতে ভালো লাগে,খুব স্বপ্ন দেখি । কিন্তু যখন পড়তে গিয়ে এর মধ্যে ঢুকি,অনুশীলন করি,তখন বেশ অনুভব করতে পারি ঢাকাবাসীর জন্য একটি তেতো বিষয় চিনির মোড়কে করে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে এবং নিকট ভবিষ্যতে ঢাকা নগরের সকল আবাসিক জমির মালিক,বিশেষত দুই কাঠা থেকে পাঁচ কাঠার ক্ষুদ্র জমির মালিকগণ তা উপলব্ধি করতে পারবেন এবং তখনি DAP 2016-2035 এর গোমর সকলের কাছে বিশেষভাবে উন্মোচিত হবে ।

দুই

গরিব জনগণের জন্য বেশ সাশ্রয়ী আবাসন,ব্যক্তি মালিকানা বিহীন পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ঢাকা শহর, সরু রাস্তা বড় হলে জমির মালিক ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাই সরুই ভালো, এমন অনেক স্বপ্ন দেখানোর পরে যখন এলাকা ভিত্তিক FAR এর বিষয়গুলো আসে তখন সেই গরিবদের কথাগুলো চিন্তায় থাকেনা, তখন এলাকাভিত্তিক FAR শুধুমাত্র তিন/চারটি বিশেষ এলাকা এর জন্য মুঠোটা খুলে যে লেখা হয়েছে সেটাও অনুভব করবেন । উদাহরন স্বরুপ বলা যায় – বারিধারার জন্য এলাকা ভিত্তিক এফ.এ.আর এর মান ৫.৪ কিন্তু তার পাশেই বাড্ডার জন্য FAR-এর মান ১.৩ ।গুলশান বনানীর জন্য এফ.এ.আর এর মান ৫ কিন্তু করাইলের জন্য FAR এর মান ১.১ । ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার জন্য FAR এর মান ৪.৭ কিন্তু পাশেই ঝিগাতলার জন্য FAR এর মান ১.৪ ।গরিবের জন্য প্রণীত ড্যাপের এমন আরো উদাহরণ ড্যাপের এলাকা ভিত্তিক FAR এর প্রস্তাব দেখলেই অনুভবে নিতে পারবেন ।প্রশ্ন তুললেই উত্তর আসবে কম মান দেয়া এলাকাতে সুযোগ সুবিধে কম তাই ওরা এমনি থাকুক,ভবিষ্যতে মান বাড়াতে পারলে তখন চিন্তা ।কিন্তু একটি এলাকার সকল সম্ভাবনার অপমৃত্যু যে ঘটে যাচ্ছে তা প্রণয়নের সময় আর অনুভবে নেয়া হয়নি ।

তিন

ব্যাক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক জমির মালিকগণও বেশ বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন,এমনকি কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে অকশনে কেনা জমির জন্য NR বা নন রেস্ট্রিক্টেড FAR বাতিল করার এক সিদ্ধান্ত DAP 2016 to 2035-এ এসেছে । কিন্তু এ বাণিজ্যিক জমির FAR কেন কমানো হলো বুঝছিনা, তাহলে বাণিজ্যিক জমিও কি জনঘনত্বকে বাড়াবে,বাড়ালে তা কিভাবে সেটাও বিশেষ চিন্তার বিষয় । তবে অকশনে কেনা পিওর বাণিজ্যিক জমিতে একটি অর্থনীতি যে খুব গভীর ভাবে জড়িত সেটা কি আমরা ভুলে গিয়েছি?

চার

সরকারের এক বিঘা আকৃতির দাপ্তরিক প্লটে, সরকারি অফিস ভবন নির্মাণের জন্য ৮০ ফুট রাস্তার পাশে আগে যে ২০ তলা বা ২৫ তলা উচ্চতার বহুতল ভবন তৈরী হতো সেগুলো নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী ১১ (এগারো) তলা পর্যন্ত উঁচু হয়ে থমকে দাঁড়াবে ।কারণ NR বা নন রেস্ট্রিক্টেড FAR বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে । বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, নিজেই দেখুন কিংবা প্রণেতাদের প্রশ্ন করুন ।আপনি ভবনের নিচতলা কিংবা বেসমেন্ট এ পার্কিং সংস্থান করবেন তাহলে অফিসের জন্য ব্যবহার উপযোগী ক্ষেত্রফল আরো কমলো । কারণ ভবনের অভ্যন্তরে গাড়ি পার্কিং এর সংস্থান করলে তা FAR-এর অন্তর্ভুক্ত হবে, কোনো ছাড় দেয়ার প্রস্তাব করেনি আর প্লট যদি ৬০ ফুট রাস্তার পাশে হয় তাহলে এই এক বিঘা প্লটে পঞ্চাশ শতাংশ (৫০%) জমি খালি রেখে আপনি ৯ তলা উচ্চতার ভবন পাবেন ।আমাদের নির্মাণ জমি সল্পতার মহানগরে অদ্ভুত এক ড্যাপ বাস্তবায়নের প্রস্তাবনা ।

পাঁচ

আসলে DAP 2016-35 -এ মহানগরী বাঁচানোর জন্য জনঘনত্বের নিয়ন্ত্রণ এর কথা বলে কিছু কিছু বক্তব্য এতো সুন্দর ভাবে চিনি দ্বারা আবৃত করে এখানে এসেছে,তার টেকনিক্যালি বিশ্লেষণ না হলে বাস্তবতাহীন অংশের সেই কথাগুলো কখনোই সাধারণের জন্য অনুধাবন কোনোভাবে সম্ভবপর হবেনা ।আপনাদের জন্য,সরল ভাবে পুরো বিষয় অনুধাবনের জন্য একটুখানি সময় পেলেই আমার বিশ্লেষণগুলো আপনাদের নিকট উপস্থাপন করে চলবো । হয়তো আমার এ ভাবনা কিংবা বিশ্লেষণ আপনাদের বোধগম্য না হলে কিংবা বিশ্বাস করতে কষ্ট হলে নিজে একটু কষ্ট করে ড্যাপের দ্বিতীয় খসড়া পড়ে দেখতে পারেন ।আমি বাংলাদেশের নাগরিক,আমি ঢাকা শহরে থাকি,শহরকে আমিও ভালোবাসি । এই দেশকে,দেশের মানুষকে আমি ভালোবাসি ।তাই COVID উত্তর সময়কালে যখন জনগণের অর্থনৈতিক,সামাজিক ও মানসিক পরিস্থিতি মাইনাস থেকে শূন্যতে নিয়ে এসে সমুখের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সকলের প্রানান্তকর প্রচেষ্টা চলছে তখন ড্যাপের বাস্তবতা বিবর্জিত এমন জটিল চিন্তার ফসল বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা মহানগরীর জনগণের জন্য নতুনভাবে অতিমারীসম ধাক্কা স্বরূপ সমুখ পথে আগানোর জন্য বেশ অন্তরায় হবে ।

পরের পর্বের লিংক
https://arch-bangla.com/dap_2016-35_opinion2/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *