PPP ও বাংলাদেশের পুরাকীর্তি- কেসস্টাডি পানাম নগর

PPP ও বাংলাদেশের পুরাকীর্তি- কেসস্টাডি পানাম নগর

Public Private Partnership বা PPP বিশ্বব্যাপী গ্রহনযোগ্য একটি উন্নয়নমূলক নীতি। এটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের একটি অন্যতম প্রতিশ্রুতি। শুরুতে এর সম্পর্কে কিছুটা বলে নিই। তারপর কেন এ লেখার অবতারনা করলাম তা বিশ্লেষণ করা যাবে। Public Private Partnership এমন এক নীতি যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য সরকারের Public Sector Authority এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানীর মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়। যেখানে প্রকল্প ভেদে আংশিক বা সম্পূর্ণ অর্থায়ন সরকারী প্রতিষ্ঠান করে থাকে। সাধারনত সে সব প্রকল্প দেশের জন্য জরুরী কিন্তু বেসরকারী উদ্যোক্তারা সহজে আসতে চায়না সেসব প্রকল্পে বেসরকারী বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্পূর্ণ অর্থের যোগান দিয়ে থাকে। এ পদ্ধতিটি PPP, P3 বা P-Cube নামেও পরিচিত।
এই PPP এর আওতায় আমাদের পুরাকীর্তি কিভাবে রক্ষা করা সম্ভব সে বিষয়ে আলোকপাত করাই লেখকের কলম ধরার উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের পুরাকীর্তি সমূহ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বহুবার উচ্চারিত হলেও সরকারী অর্থের জোগান ও যথোপযুক্ত উদ্যোগের অভাবে আজও এর কোন উন্নয়ন সাধিত হয়নি। আমাদের নেতারা PPP দিয়ে দেশের উন্নয়ন বলতে যেন ব্রীজ আর রাস্তাঘাট বানানোই বোঝেন। বিধিবাম আবারও উপেক্ষিত বাংলার ভগ্নপ্রায় স্থাপত্য পুরাকীর্তি। সংস্কৃতির উন্নয়ন চাওয়া যেন আমাদের মতো দরিদ্র দেশের জন্য বিলাসিতা। অথচ অর্থের দিক থেকে আমরা দরিদ্র হলেও মেধা, মনন, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিতে যে আমরা কতটা ধনী তা দেখে তো ফড়িয়া দেশগুলো রীতিমতো ঈর্ষান্বিত। ভারতবর্ষে বাল্মিকী যখন রামায়ণ রচনা করছেন তখন মার্কিন মুলুকের মানুষেরা বর্বর শিকারে ব্যস্ত, সাহিত্য রচনাতো সুদূর পরাহত। আর আজ আমরা আমাদের সেই গৌরবগাথা ভুলে নিজকে আত্নগ্লানিতে পরিপূর্ন করছি। এই গ্লানির প্লাবনে বাঙ্গালী একদিন নিমজ্জিত হয়ে হারাবে নিজেকে, নিজের ঐতিহ্যকে।
আরেকটি বিষয় যথেষ্ট ভাবিয়ে তোলার মতো। সেটা হলো বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন। এর প্রভাব বাংলাদেশে ব্যাপক। এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পরিমান বেড়ে যাবে। এখানে ভেবে দেখার দরকার যদি ভগ্নপ্রায় পুরাকীর্তিসমূহ সংস্কার করা না হয় তবে তারা কি সেই অতিবৃষ্টির ধকল সহ্য করতে পারবে? বিভিন্ন ভবনে যে সূক্ষ কারুকাজ আছে তা কতটাই বা টিকে থাকবে সর্বোপরি ভবনটাই আদৌ বিদ্যমান থাকবে কিনা তাতেও শংকা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন বস্তুত এ অঞ্চলের পুরাকীর্তিসমূহের জন্য খুবই বড় ধরনের হুমকি এবং ভাবিয়ে তোলার বিষয়। তখন কালের আবর্তে নয় আমাদের অবহেলার আবর্তে হারাবো আমাদের WORLD HERITAGE—এর অন্তভূর্ক্ত জাতীয় অহংবোধের স্থাপনাসমূহ। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের প্রত্নস্থাপত্য সংরক্ষণ এখন জাতিসত্তা রক্ষার সামিল।

আমাদের ভগ্নপ্রায় গৌরবগাঁথা রক্ষনাবেক্ষণ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপর ন্যস্ত। অথচ সরকার একে পঙ্গু অধিদপ্তর করে রেখেছে। এসব স্থানের দু—একটি বাদে সবগুলোতেই দেখা যায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড থাকলেও থাকে না কোন কেয়ারটেকার। জায়গাগুলো গোচারণভূমি, গণশৌচাগার বা বখাটে ছেলেদের আড্ডাখানায় পরিনত হয়েছে। চুরি হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান প্রত্নসামগ্রী।

বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর তুলনায় বিনোদনের জায়গা বড়ই অপ্রতুল। বিভিন্ন পালা পার্বনে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের যে ঢল নামে তাতে উপভোগ্য পরিবেশ পাওয়া মুশকিল। এটা উপলব্ধি করেই ঢাকা ও এর আশেপাশে প্রচুর বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোই এ সবের উদ্যোক্তা। তারা সবাই গতবাধা বিনোদন পার্ক গড়ে তুলছে। অথচ সরকার যদি তাদেরকে সঠিক দিকনির্দেশনা ও অনুদান দেয় তবে তারা তাদের বিনিয়োগকে অর্থবহ করে তুলতে পারবে। একেকটা পুরাকীর্তিকে কেন্দ্র করে যদি একেকটা বিনোদন কেন্দ্র গড়ে ওঠে তাহলে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ যেমন সার্থক হবে তেমনি বাঁচবে আমার হাজারবর্ষের গৌরব ও ঐতিহ্য। বস্তুতঃ আমাদের অর্থ আছে, উন্নয়নমূলক প্রক্রিয়াও আছে নেই শুধু সদিচ্ছা ও সমন্বয়। পক্ষান্তরে ঐতিহাসিক স্থানে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠলে স্থানগুলো যেমন রক্ষণাবেক্ষণ হবে তেমনি নতুন প্রজন্ম এসব স্থানে বিনোদন করলে তাদের চিত্ত ও চেতনায় আমাদের ইতিহাস ও সংষ্কৃতিও প্রোথিত হবে।

পুরাকীর্তি সংরক্ষনের এই কাজ করতে হবে দেশব্যাপী। তবে ঢাকা যেহেতু সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং এর আশেপাশে বর্তমানে প্রচুর বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠছে তাই সরকার পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার পাশের কোন প্রত্নস্থাপত্যকে PPP এর আওতায় সংরক্ষণ করে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে পারে। তারপর এই কার্যক্রম দেশব্যাপী বাস্তবায়িত হতে পারে। খেয়াল রাখতে যাতে সবগুলো পুরাকীর্তিতেই একই রকমের বিনোদন কেন্দ্র গড়ে না ওঠে এবং বিনোদনের আতিশয্যে আমাদের পুরাকীর্তির গুরুত্ব ও সম্মান যাতে ম্লান হয়ে না যায়। স্থাপনাটির গুরুত্ব বুঝে একেক জায়গায় একেক রকম লাগসই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একে সার্থক করে তুলতে হবে। কোথাও ভবনটি নিজেই(যেমন আহসান মনজিল), কোথাও ভবনকে ঘিরেই(রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ী) অথবা কোথাও ভবনটি (যদি সেটা উপাসনালয় হয়) থেকে সামান্য দূরে যাতে ভবনের গাম্ভীর্য বজায় থাকে আবার দর্শনার্থীদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে এমনভাবে স্থানটিকে আকর্ষণীয় ও ব্যবসায়ীকভাবে সাফল্যমন্ডিত করা যেতে পারে।

আমাদের নাগরিক সংস্কৃতির আদিসুর হিসেবে সোনারগাঁও ও পানাম নগরের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই একে সংরক্ষণ, পর্যবেক্ষন এবং গবেষনা অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু বর্তমানে এ অঞ্চলে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও অবৈধ দখলদারিত্বের কারনে এসব স্থাপনা হুমকির সম্মুখীন। পক্ষান্তরে সোনারগাও ও পানাম নগর যেহেতু ঢাকা শহর থেকে অপেক্ষাকৃত কাছে ও কারুপল্লী অংশে এখনও বিস্তর জায়গা বিদ্যমান এবং এর ব্যবসায়িক সাফল্য অপেক্ষাকৃত দ্রুত আসতে পারে তাই লেখক সরেজমিনে ঘুরে ওই অঞ্চলের জন্য আলোচ্য প্রস্তাবনা রাখছেন। এভাবে প্রতিটা স্থাপনা বিশ্লেষণ করে একটা পথ বের করে আনতে হবে। সরকার প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ থেকে স্থপতি তৈরী করছেন অথচ তাদের মেধাকে এই খাতে কাজে লাগাচ্ছেন না। হায়রে আবারও সেই সমন্বয়হীনতা।

কেসস্টাডি—পানামনগর,সোনারগাঁও,নারায়ণগঞ্জ:

সোনারগাঁও নারায়নগন্জ জেলা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বে এবং ঢাকা থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দক্ষিন-পূর্বে অবস্থিত। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে প্রায় দেড় কিলোমিটার পাকা সড়কের মাধ্যমে এটি সংযুক্ত। সোনারগাঁও বা পানাম নগর বাংলাদেশের প্রাক—নাগরিক উন্নয়নের অন্যতম উদাহরন।বাংলার অন্যতম প্রতাপশালী শাসকগোষ্ঠী বার ভুঁইয়াদের রাজধানী ছিল সোনারগাঁও। অনমনীয়, বীর বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বার গৌরবের এক অনন্য উদাহরন পানাম নগর। এ নগর মূলত: ব্রিটিশ রাজকীয় ধারায় নির্মিত ভবনের সমন্বয়ে গঠিত। সোনারগাঁও দ্বাদশ শতাব্দীতে তিনটি নদীর সংযোগস্থলে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। তখন এর নাম ছিল ”সোভার নগ্রম”। এর অবস্থান মেঘনা, শীতলক্ষ্যা এবং ধলেশ্বরী নদীর সংযোগস্থলে হওয়ায় এটি মধ্যপ্রাচ্য এবং দুরপ্রাচ্যের সাথে যোগাযোগের জন্য বিখ্যাত বন্দরে পরিনত হয়েছিল। ১২৯৬ থেকে ১৬০৮ সন পর্যন্ত এটা ছিল পূর্ববাংলার মুসলিম শাসকদের রাজধানী। সুপরিচিত গ্রান্ড ট্রাংক রোড (যা বর্তমানে ঢাকা—চট্টগ্রাম মহাসড়ক) এর সাথে এই নগরী সংযুক্ত ছিল।

সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণঃ

ঐতিহাসিক ভবন ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে অপেক্ষাকৃত নতুন ধারনা। বিশ্বে পুরাকীর্তি সংরক্ষনের কাজ শুরু হয় মূলতঃ ১৯৩১ সালে গ্রীসের এথেন্সে। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে ইউনেস্কোর পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বব্যাপী এই কর্মকান্ড ছডিয়ে পড়ে। বর্তমানে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কর্মকান্ড। কোন পুরাকীর্তি সংরক্ষণ ও সংস্কারের রয়েছে তিনটি পর্যায়। পর্যায়গুলো হচ্ছে—[Ref-1]
ক) পুণরুদ্ধার বা Restoration: এটি একটি গবেষণাধর্মী জটিল ক্রিয়া। এ পর্যায়ে রক্ষিত ভবনটির ভগ্নপ্রায় অবস্থা থেকে তৎকালীন ইতিহাস ও স্থাপত্যধারা বিশ্লেষণ করে এর বিভিন্ন স্থাপত্যিক নকশা ও অলংকরণ সম্পূর্ণ বা যতটা সম্ভব পুণঃরুদ্ধার করে একে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।
খ) রক্ষণাবেক্ষণ বা Preservation: পুনরুদ্ধারকৃত স্থাপনাকে কালের আবর্তে অক্ষুন্ন রাখাকেই অক্ষুন্নকরণ বা Preservation বলা হয়। অথার্ৎ প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা ভবনের জন্য ক্ষতিকারক কোন কিছু থেকে স্থাপনাটিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করে তার আদিরূপ অটুট রাখাই এ পর্যায়ের অন্তভূর্ক্ত।গ) সার্বিক সংরক্ষণ বা Conservation: সার্বিক সংরক্ষণ বা Conservation বলতে বুঝায় পুণরুদ্ধারকৃত ভবনকে সংরক্ষণ করে এর পরিবেশকে সমুন্নত রাখা। সার্বিক সংরক্ষণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। অর্থাৎ প্রথম দু’টি পর্যায় সম্পন্নপূব্বর্ক ভবনকে ব্যবহার উপযোগী করে এর জীবনকাল ধরে রাখাই সার্বিক সংরক্ষন। এক কথায় আমরা বলতে পারি কোন ঐতিহাসিক ভবন বা স্থাপনাকে পুণরুদ্ধার করে একে অক্ষতঅবস্থায় দীর্ঘসময় টিকিয়ে রেখে এর স্থাপত্য ও পরিবেশকে সমুন্নত রাখাই স্থাপতিক সংরক্ষন বা Architectural Conservation.সুতরাং সোনারগাঁও ও পানামনগরের সংরক্ষণ একটি গবেষণাধর্মী, সময়সাপেক্ষ, সূচারু, ব্যয়নির্ভর ও ব্যাপক প্রক্রিয়া। এ অঞ্চলটিতে করনীয় চারটি বিষয় রয়েছে।
ক) পুণরুদ্ধার;
খ) রক্ষণাবেক্ষণ;
গ) সংরক্ষণ এবং
ঘ) স্থানটির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে এর উন্নয়ন।

অঞ্চলটির সাথে ঐতিহাসিক সঙ্গতিপূর্ণ বিনোদনমূলক উন্নয়নঃ

আলোচনার সুবিধার্থে “পানাম নগর অংশ” এবং “সোনারগাঁও কারুপল্লী অংশ”—এর আলাদা আলাদা উন্নয়ন ব্যাখ্যা করা হলো। পানামনগর ও সোনারগাঁওকে অঞ্চল ভেদে ঐতিহ্যগত ও বিনোদনমূলক উপাদানের সমন্বয়ে উন্নয়ন সাধন করে এদুটি স্থানের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

পানাম নগর অংশ:

Panam Nagar Site Plan -1996, Source: FB Group: Panam – A Lost City of Ancient Bengal

পানাম নগর আমাদের নাগরিক সভ্যতার আদিসূর। স্থাপত্যিক নান্দনিকতায় উৎকৃষ্ট ও কালের মহিমায় উজ্জ্বল ভবনের সমাহার রয়েছে এখানে। তাই এর প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। কেমন ছিল আমাদের আদি নাগরিক সভ্যতার প্রাকার তা আমরা খুঁজে পাই পানাম নগরের স্থাপনা বিন্যাস ও নির্মাণশৈলী থেকে। আমাদের প্রাপ্ত প্রত্নস্থাপত্যের মধ্যে নগর সংষ্কৃতির উদাহরন বিরল। অথচ এখানকার ভবনগুলোই রয়েছে সবচেয়ে অবহেলায়। এর জীর্ণদশা সত্যিই বেদনাদায়ক। অধিকাংশ ভবনে বিভিন্ন গাছ ও গুল্মলতা জন্মেছে। অনেক ভবনই পুরোপুরি ধবংস হয়ে গেছে। এখনই এর প্রতি নজর না দিলে আমাদের আদি নাগরিক সভ্যতার নিদর্শন হয়তো একটুও অবশিষ্ট থাকবে না। আমরা হারাবো আমাদের শেকড়। এই পানাম নগরের রাস্তার দু’পাশের গুরুত্বপূর্ণ ভবনসমূহ আংশিক বা সম্পূর্ণ পুণঃসংস্কার করে তা প্রদর্শনীর জন্য উন্মুক্ত করা দরকার। এতে করে আমাদের বর্তমান ও নতুন প্রজন্ম তাদের আদি নগর ও স্থাপত্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারবে।

প্রথমতঃ এ অঞ্চলের জন্য প্রয়োজন ভবনগুলোকে দখলদারিত্বমুক্ত করা। সবগুলো ভবনই বিভিন্নভাবে দখল হয়ে যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নিঃগৃহীত হচ্ছে আমাদের প্রত্নসম্পদ। দখলদাররা প্রতিনিয়ত সংষ্কারের নামে ভবনসমূহের আদি স্থাপত্যশৈলী ধ্বংস করছে। তবে উচ্ছেদ নয় পুণবার্সনের মাধ্যমে এখানকার বাসিন্দাদের কবল থেকে ভবনগুলো রক্ষা করা দরকার।

দ্বিতীয়ত দরকার পানামনগরের মাঝ বরাবর দিয়ে চলে যাওয়া পিচঢালা রাস্তাটির দিক পরিবর্তন। বর্তমানে এ রাস্তা দিয়ে অনবরতভাবে যানবাহন চলাচল করে দু’পাশে দন্ডায়মান পুরাকীর্তিকে প্রতিনিয়ত শাসিয়ে যাচ্ছে এর অস্তিত্ব হণনের জন্য। তাই এলাকাবাসির যাতায়াতের জন্য একটি বাইপাশ সড়ক নির্মাণ করে পানাম নগরের রাস্তাটি শুধুমাত্র পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা দরকার। যেখানে দর্শণার্থীরা পায়ে হেঁটে দুপাশের স্থাপত্যিক নিদর্শণ উপভোগ করতে পারবে।

উপরের দুটি ধাপ সম্পন্ন না করলে প্রধান ও তৃতীয় ধাপটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ভবনগুলোকে পর্যায়ক্রমে পুণরুদ্ধার বা Restoration, রক্ষণাবেক্ষণ বা Preservation ও সার্বিক সংরক্ষণ বা Conservation করতে হবে। উপযোগী পুনর্ব্যবহার বা Adaptive Reuse এর মাধ্যমে পানাম নগরের ভবনসমুহকে টিকিয়ে রাখা যেতে পারে। অথার্ৎ এসব ভবনের আদি অবস্থার পুনরুদ্ধার করে এর যথার্থ ব্যবহার উপযোগীতা নির্ধারণ করতে হবে। যেমনঃ
ক) অপেক্ষাকৃত বড় আকারের ভবনসমূহ বিশ্রামাগার বা হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
খ) কোনটাকে যাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
গ) যেসব ভবনের অভ্যন্তরে উন্মুক্ত আঙ্গিনা আছে সেগুলোকে চিত্রশালা অথবা নাচ—গানের স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘ) যেসব ছোট বাসভবন ছিল সেগুলোকে কুটিরশিল্পের দোকানে রূপ দেয়া যেতে পারে।
ঙ) এর কোনটাকে পুরোপুরি সংস্কারের মাধ্যমে রেস্তোরাতে পরিণত করে সেখানে পর্যটকদের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
চ) প্রতিদিন সন্ধ্যায় বিদ্যমান রাস্তাটির ওপর পর্যটক সমাগম ঘটিয়ে এখানকার ভবনসমূহে লাইট এন্ড সাউন্ড শোর ব্যবস্থা করে আকর্ষণীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে বারভূইয়া ও এই নগরীর ইতিহাস পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে।

সোনারগাঁও কারুপল্লী অংশঃ

সোনারগাঁও কারুপল্লীতে যে পরিমান পর্যটক আসেন তাদের বড় একটা অংশ পানাম নগর পরিদর্শণ না করেই তাদের গন্তব্যে ফিরে যান। তাই কারুপল্লী অংশেই পানাম নগরের অবস্থান নির্দেশক তথা তৎকালীন নগরীর মানচিত্র সংরক্ষিত রাখতে হবে। সোনারগাও কারুপল্লী থেকে টমটম গাড়ীর মাধ্যমে পানাম নগরে যাতায়াতের ব্যবস্থা করলে পর্যটকরা বিনোদনের যেমন বাড়তি উপাদান পাবেন তেমনি প্রচুর পরিমান দর্শনার্থীর সমাগম পানাম নগরে ঘটানো যাবে। ফলে অঞ্চলদুটোর মধ্যে নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং প্রকল্পটি আরও সাফল্যমন্ডিত করা যাবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পারবো পুরাকীর্তি সংরক্ষণ সফলভাবে করে তারা কতটা লাভবান হচ্ছে। শুধু বিদেশেই নয় আমাদের দেশের আহ্সান মঞ্জিল সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং সেখানে দর্শণীর বিনিময়ে পর্যটকরা ভ্রমণ করছেন।
বর্তমানের বিদ্যমান কারূপল্লী কমপ্লেক্সটির আরও প্রসারের স্বার্থে সম্পূর্ণ এলাকাটিকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে ঐতিহ্যগত ও বিনোদনমূলক বিভিন্ন উপাদান দিয়ে বিনোদনমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করলে এটি হয়ে উঠতে পারে অনেক আকর্ষনীয়। নিচে কয়েকটি প্রস্তাবনা রাখছি।

বর্তমান যাদুঘর অংশটি কারুশিল্প যাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে রয়েছে পুরাতন ও নতুন যাদুঘর, গ্রন্থাগার, বিক্রয়কেন্দ্র, ক্যান্টিন ও কারুপল্লী। রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি পিকনিক স্পট। তবে সমস্ত চত্বরটিতে রয়েছে যত্নের অভাব। এখানে বিদ্যমান পুরাতন যাদুঘর ভবন যা ঐতিহাসিক ভাবে বড় সর্দার বাড়ী নামে পরিচিত, তার যে বেহাল অবস্থা তা সত্যিই দুঃখজনক । ভবনটির বাইরের সূক্ষ কারুকাজ ও অলংকরন অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর অভ্যন্তরে দক্ষিনের আঙ্গিনার বারান্দার কারুকাজ, উপরের ভগ্নপ্রায় দেয়াল যে কোন সময় খসে পড়ে ঘটতে পারে দূর্ঘটনা। কাজেই এর সংষ্কার অতীব জরুরী। আরেকটি অবহেলার উদাহরন নতুন যাদুঘর ভবন। সোনারগাঁও এর মতো ঐতিহাসিক স্থানে বিদ্যমান পুরাকীর্তির সাথে কোন প্রকার সঙ্গতি না রেখে ভবনটি তৈরী করা হয়েছে। এ ভবনটির সন্মুখদৃশ্য পরিবর্তন করে বড় সর্দার বাড়ীর সাথে সঙ্গতি রেখে তৈরী করা জরুরী।

  • এমন একটি অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে যেখানে পর্যটক/অতিথিরা সপরিবারে বিভিন্ন দেশী বিদেশী এমিউজমেন্ট রাইডের মাধ্যমে আনন্দ বিনোদন করতে পারে। এটি হতে পারে কারুপল্লী অংশে যে উম্মুক্ত জায়গা আছে তার কিয়দংশ জুড়ে। এখানে বিভিন্ন ফুডকোর্ট, কুটিরশিল্পের ষ্টল থাকতে পারে। এদেশের আদি ও মেলার রাইডগুলোকে স্থানীয় প্রযুক্তির লাগসই প্রয়োগ করেও এখানে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন নাগরদোলাকে মেকানাইজ করে ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • আমাদের বিভিন্ন লোকজ সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা সম্বলিত একটি অঞ্চল তৈরী করা যেতে পারে যেখানে জারী, সারী গানের আসর বসবে, পুঁথি পাঠের আসর বসবে । অর্থাৎ মুক্তমঞ্চে গাছের ছায়ায় গ্রামীন আবহে বাউল গানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যাত্রা অনুষ্ঠানের জন্য যাত্রা প্যান্ডেল তৈরী করা যেতে পারে। আমাদের গ্রামীন মেলার অন্যতম উপাদান বায়োস্কোপ এর ব্যবস্থা থাকতে পারে। এসব স্থানে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যাবে।
  • আমাদের নদী—মাতৃক বাংলাদেশের নদী—সংস্কৃতির এক অনন্য রূপক হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে বর্তমানে বিদ্যমান জলাশয়কে। এখানে বিভিন্ন ধরনের নৌ—ভ্রমণের ব্যবস্থাসহ আমাদের লোকজ নৌকা যেমন সাম্পান, বজরা,পাল তোলা নৌকা, গুণটানা নৌকা প্রভৃতির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
  • এই জলাশয়ে নৌকা বাইচের আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের নদী—সংস্কৃতির একটি উপাদানের সংযোগ ঘটানো যেতে পারে।
  • একই সাথে এখানে ভাসমান রেস্তোরা, মোটেল স্থাপন করে পর্যটকদের আরও আরামদায়ক ও বিনোদনমূলক পরিবেশ দেয়া যেতে পারে।
  • এ জলাশয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা ও জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্যের আয়োজন করলে পর্যটকরা আরও বিনোদনের সুযোগ পাবে।
  • এই জলাশয়ের পাশে আমাদের বেদে সম্প্রদায়কে স্থাপন করলে আমাদের নদীমাতৃক জীবন-সংষ্কৃতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপাদান সংযোজিত হবে।

আলোচ্য প্রকল্পটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক Conservation একটি ব্যাপক ও ব্যায় বহুল প্রক্রিয়া, সুতরাং এর জন্য সরকারের সজাগ ও সহযোগিতাপূর্ণ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। তাই প্রাথমিক পর্যায়েই স্থানটিকে চলনসই রূপ দিতে গেলেও বড় অংকের বিনিয়োগ না হলে এটি স্বার্থক নাও হতে পারে। সুতরাং, যাবতীয় শর্তপূরণ ও উন্নয়ন সাপেক্ষে যদি অঞ্চলটির প্রসার ঘটানো যায় তবে এটি হবে একটি যুগোপযোগী ও যথার্থ উদ্যোগ এবং একটি সার্থক প্রকল্প। অতএব কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে উপরোক্ত পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন ও সংস্কার করে বর্তমান সোনারগাঁও—পানামনগরকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা যেতে পারে। যা আমাদের জাতিকে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করতে পারবে আরও আত্মবিশ্বাসী হিসেবে। তবে এসবই সম্ভব একটি সমন্বিত উদ্যোগ ও পর্যায়ভিত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে। সরকারের সদিচ্ছা ও সহযোগিতা এবং বেসরকারী উদ্যোগের চেষ্টা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের যথার্থ সমন্বয় ঘটিয়ে Public Private Partnership—এর মাধ্যমে আমাদের গৌরবময় একটি উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। আমাদের অতীত গৌরবের সোনারগাঁও হয়ে উঠতে পারে আমাদের বর্তমান গৌরবের প্রতীক।


Ref-1= ডিজাইন রীতি ও স্থাপত্য ধারা, আবু এইচ ইমামুদ্দিন
[ লেখকঃ স্থপতি মুহাইমিন শাহরিয়ার, প্রধান স্থপতি, ডিকন্সট্রাকশন আর্কিটেক্টস]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *