প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে::গবেষণামূলক প্রকল্প (শেষ পর্ব-০৩)

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে::গবেষণামূলক প্রকল্প (শেষ পর্ব-০৩)

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে _জলদুর্গের গঠন ও প্ল্যান

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে
বিভিন্ন জলদুর্গের গাঠনিক নকশা। যথাক্রমে- সোনাকান্দা, হাজীগঞ্জ ও ইদ্রাকপুর দুর্গের নকশা।

এক একটি জলদুর্গের আকার এক এক রকম। যে তিনটি দুর্গ স্থাপনা টিকে রয়েছে। তাদের তিনটার আকার ও ভিন্ন। জ্যামিতিক কনফিগারেশন অনুযায়ী একটি আরেকটির চেয়ে ছোট বা বড়। এ বিষয় থেকে একটা বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা নেয়া যায় যে, প্রতিটা দুর্গ বিভিন্ন আকারের। কারো সাথে কারো মিল নেই।

সোনাকান্দা জলদুর্গের আকার আয়তাকার। এই জলদুর্গটি মুঘল আমলের অপরাপর জলদুর্গ থেকে আকারে বড়। জলদুর্গের দৈর্ঘ্য ৩২৫ ফুট ও প্রস্থ ২২৮ ফুট। দুর্গের পশ্চিমদিকে বর্ধিত বৃত্তীয় বেদী সহ দৈর্ঘ্য ৬৪ ফুট প্রায়। জলদুর্গের অভ্যন্তরভাগ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।

হাজীগঞ্জ জলদুর্গটি মুঘল আমলের অন্যসব দুর্গের চাইতেও আকারে বড় । এই জলদুর্গটি অসমবাহু বিশিষ্ট। জ্যামিতিক আকার অনুযায়ী ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের আলোকে এই জলদুর্গটি ষড়ভুজাকার। সময়ের পরিক্রমায় এক সময় জলদুর্গটি ভেঙ্গে গিয়েছিলো তখন একে এক কোনা ভাঙ্গা অবস্থায় পঞ্চভুজাকার মনে হতো। পরবর্তীতে, এই পঞ্চভুজাকার দুর্গকে রেনোভেশন করে ষড়ভুজাকার দুর্গে রূপান্তর করে প্রত্নতক্ত  বিভাগ। কিন্তু মূল ভূমির নকশা অনুযায়ী, এই জলদুর্গটি ষড়ভুজাকার। প্রাচীন নথি ও ঐতিহাসিক বই সমূহে এমন তথ্য’ই মেলে। প্রবেশতোরণ সহ এই জলদুর্গের উত্তর বাহুর পরিমাপ ৪৪.০৪ মিটার। অর্থাৎ, প্রতি বাহুর পরিমাপ অনুযায়ী, ১৯.৪৩ মিটার, ৫.১৮ মিটার ও ১৯.৪৩ মিটার এর যোগফল। তাছাড়া দুর্গের অপরাপর বাহুগুলো প্রায় ৩.৬০ মিটার ও ৩.৬১ মিটার পরিমাপ বিশিষ্ট। জলদুর্গের উচ্চতা প্রায় ১.৮৩ মিটার। জলদুর্গের অভ্যন্তরভাগ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। সোনাকান্দা জলদুর্গের ন্যায় এই দুর্গটিও প্রাসাদ দুর্গ নয়।

ইদ্রাকপুর কেল্লাটি চতুভুজাকার। মুঘল আমলের অপরাপর জলদুর্গের থেকে এই দুর্গটি আকারে ছোট। এই কেল্লার আয়তন প্রায় ৮২ মি.×৭২ মি।

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে
হাজীগঞ্জ দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও সম্মুখভাগ

 

 

 

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে
সোনাকান্দা দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও পশ্চিম দিক
প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে
সোনাকান্দা দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও সম্মুখভাগ।

 

 

 

 

 

 

জলদুর্গের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সমূহ

তিনটি জলদুর্গ নিয়ে গবেষণা ও বিস্তর আলোচনা সাপেক্ষে যে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যায় তা হলো,

  • প্রধান ত্বোরণ দ্বার (arcade gate)
  • প্রতিরক্ষা প্রাচীর (fortification wall)
  • কেন্দ্রীয় অঙ্গন (central courtyard)
  • কোণের বুরুজ (corner bastions)
  • কামান স্থাপনের বেদী (the altar of the cannon)
  • কামান স্থাপনের বেদীর প্লাজা (the altar plaza for the cannon)

প্রধান ত্বোরণ দ্বার

প্রতিটা জলদুর্গে প্রধান তোরণদ্বার রয়েছে। এই বাংলায় মুঘল আমলের যে কয়টা জলদুর্গ টিকে আছে সবকটায় একটি মাত্র তোরণদ্বারের অস্তিত্ব দেখা যায়। এই তোরণদ্বারের উচ্চতা প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উচ্চতার চেয়ে বেশি। প্রতিটা তোরণদ্বার উত্তরদিকে অবস্থিত। এই তোরণদ্বারের দুই পার্শ্বে ও বিপরীতদিকে রয়েছে দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর।

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে
সোনাকান্দা দুর্গ, হাজীগঞ্জ ও ইদ্রাকপুর দুর্গের প্রধান তোরণদ্বারের নকশা।

 

 

 

 

 

 

 

এই তোরণ দ্বারের ভিতরের ও বাইরের দিকের স্থাপত্যশৈলী ও অলংকরণশৈলী দেখে মুঘল আমলের স্থাপনা বলে খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়। প্রতিটা দুর্গের তোরণদ্বারে যে সব স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় – প্রবেশ তোরণদ্বার খিলান বিশিষ্ট। যা অর্ধ গম্বুজ দ্বারা সৃষ্ট। প্রতিটা তোরণদ্বার আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে অবস্থিত। আয়তাকার কাঠামোর বাইরের প্রবিষ্ট ও ভিতরের প্রবিষ্ট তে ছোট ও মাঝারি আকৃতির প্যানেল রয়েছে। প্রতি প্যানেল আবার আলাদা আলাদা অলংকরণ সমৃদ্ধ। প্যানেল ছাড়াও প্রতি দুর্গে ছোট ছোট খোপ দেখা যায়। প্রতিটা খোপ আবার, খাঁজ বিশিষ্ট নকশা সমৃদ্ধ।

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে

তোরণশীর্ষে যে প্যারাপেট থাকে তাতে ছোট ছোট মার্লন শোভিত। প্রতিটা মারলন ফোকড়বিশিষ্ট। এই ফোকড়গুলো কামানের গোলা নিক্ষেপের জন্যে ব্যবহার করা হতো।আবার কোথাও কোথাও তোরণ শীর্ষে পদ্ম পাঁপড়ির নকশার অস্তিত্ব দেখা যায়। কোথাও কোথাও প্রবেশ তোরণ দ্বারের বাইরে ও ভিতরে ক্রম উচ্চতা সম্পন্ন সিঁড়ি দেখা যায়। যেমন -খিজিরপুর দুর্গ। যেখানে ক্রম উচ্চতা সম্পন্ন সিঁড়ি দেখা যায়, সেখানে সিঁড়ির দুই পাশে ঢালু দেওয়াল দেখা যায়।

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে
বিভিন্ন জলদুর্গের আয়তাকার কাঠামোর প্রবিষ্ট প্যানেল এ সজ্জিত অলংকরণশৈলীর নকশা।

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে

তোরণদ্বার জলদুর্গে প্রবেশের একমাত্র পথ। যাতে লৌহ দরওয়াজা বিদ্যমান । তোরণদ্বারের শীর্ষবিন্দুতে অবস্থিত মার্লনের ফোকড়গুলো কামানের গোলা নিক্ষেপের জন্যে ব্যবহার করা হতো।

প্রতিরক্ষা প্রাচীর

দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর মানে চারিপার্শ্বের পরিবেষ্টন প্রাচীর।

এই প্রাচীর ঘন ও পুরুত্ব বিশিষ্ট। প্রতিটা জলদুর্গের প্রাচীরের পুরুত্ব প্রায় ৩’-৬” প্রায়। প্রাচীরের উপরিভাগে অসংখ্য মার্লন রয়েছে, তবে সব মার্লনের দৈর্ঘ্য, ও প্রস্থ এক মাপের না হলেও উচ্চতা এক মাপ বিশিষ্ট। প্রতিটা মার্লন সমআকৃতির ফোকর যুক্ত। মার্লনের সারিতে জ্যামিতিক ফোকড়ের ক্রম দেখা যায়।

জলদুর্গের বাইরে থেকে দেখলে, ফোকড়ের ধারাবাহিকতা পুনঃপুন দেখা যায়। প্রতি দুই মার্লনের সংযোগস্থলে যে লম্বাটে বর্গীয় প্যানেল দেখা যায় তাতে একটি মাত্র ফোকর রয়েছে।

প্রতিরক্ষা প্রাচীরের শীর্ষবিন্দুতে অবস্থিত মার্লনের ফোকর যুদ্ধের ক্ষেত্রে বন্দুক স্থাপন করে যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্যে ব্যবহার করা হতো।

প্রাচীন জলদুর্গের সন্ধানে
জলদুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীর

কেন্দ্রীয় অঙ্গন

প্রতিটা দুর্গের অভ্যন্তরভাগে কেন্দ্রীয় অঙ্গন (কোর্ট ইয়ার্ড) রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু, ইদ্রাকপুর দুর্গ। ইদ্রাকপুর দুর্গের অভ্যন্তরে একটি পুস্কুরিনী দেখা যায়। এই পুস্কুরিনী দুর্গ নির্মাণের সময়কালীন নয়। পুস্কুরিনীতে চারিপার্শ্বে ঘাট রয়েছে। দুর্গের কেন্দ্রীয় অঙ্গন একেকটা একেক পরিমাপের। সোনাকান্দা জলদুর্গের অঙ্গন খিজিরপুর দুর্গ (হাজীগঞ্জ দুর্গ) ও ইদ্রাকপুর দুর্গ থেকে আকারে অনেক বড়। সোনাকান্দা ও হাজীগঞ্জ দুর্গের অঙ্গন বর্তমানে একটি খেলার মাঠ। প্রতিটা দুর্গের অঙ্গনে সবুজ ঘাসের সমারোহ দেখা যায়।  আবার বড় বড় গাছপালার দেখাও মেলে। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে – আম, লিচু, নারিকেল, মেহগনি, শিশু ইত্যাদি।

মুঘল আমলে এই দুর্গের কেন্দ্রীয় অঙ্গন যুদ্ধের সমরক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সৈনিকরা এখানে তাবু খাটিয়ে বসবাস করতো।

কোণের বুরুজ 

প্রতি দুটি দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের চার বাহু বিদ্যমান। প্রতি দুই বাহুর অন্তর্বর্তী স্থানে বুরুজ বিদ্যমান।

এই বুরুজের উচ্চতা প্রতিরক্ষা প্রাচীরের চেয়ে বেশি। বুরুজের আকার একেক দুর্গে একেক রকম। সোনাকান্দা দুর্গে অষ্টভুজাকার বুরুজ দেখা যায়। আবার ইদ্রাকপুর দুর্গে গোলীয় আকারের বুরুজ দেখা যায়। এই দুর্গের দেওয়ালে অর্থাৎ মার্লনের নীচের দিকে বিশাল আকৃতির ফোকর যা জানালা সদৃশ দেখা যায়। হাজীগঞ্জ বা, খিজিরপুর দুর্গে বুরুজ নেই। সেখানে বুরুজের পরিবর্তে গোলীয় আকারের বেদী দেখা যায়। যা ভূমি থেকে উচ্চতা সম্পন্ন ও কয়েক ধাপ সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে উঠতে হয়। বুরুজের উপরিভাগে মার্লন বিদ্যমান। প্রতিটা মার্লন ফোকড়যুক্ত।

মার্লন বিদ্যমান। প্রতিটা মার্লন ফোকড়যুক্ত।

কামান স্থাপনের বেদী

জলদুর্গের প্রধান ফাংশন হলো কামান গোলা স্থাপনের বেদী। সমগ্র দুর্গের মধ্যে এই অংশটা সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ও দেখার মতো এক স্থাপনা। তিনটি দুর্গের মধ্যে – সোনাকান্দা ও ইদ্রাকপুর দূরে একটি করে এই বেদী অবস্থিত। অপরদিকে হাজীগঞ্জ দুর্গে এই বেদীর সংখ্যা ছয়টি। এই দুর্গের দুইটা বেদী সর্বাপেক্ষা বড় আকৃতির, মাঝারি আকৃতির একটি ও ছোট আকৃতির তিনটা বেদী বিদ্যমান। কামান স্থাপনের এই বেদীগুলো দুর্গের ভূমি থেকে অনেকটা উঁচুতে। বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। বেদীগুলোর আকার বৃত্তাকার। প্রতিটা বেদী নদীমুখী করে তৈরী। যাতে কামান স্থাপনা করে নদী অভিমুখে নিশানা ঠিক রাখা যায়। বেদীর দেয়ালের উচ্চতা প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উচ্চতা থেকে অনেক বেশি। আবার পুরুত্ব ও অনেক। বৃত্তাকার বেদীর প্রতি দেওয়ালের উপরে মার্লন যুক্ত করা। এই মারলনগুলো ফোকড়যুক্ত।

কামান স্থাপনের বেদীর প্লাজা

প্রতিটা দুর্গে কামান স্থাপনার বেদীতে উঠতে বহু সিঁড়ির ধাপ পার হতে হয়। এক্ষেত্রে, সোনাকান্দা দুর্গ ও ইদ্রাকপুর দুর্গের বেদীতে উঠতে হলে সর্বাপেক্ষা বেশি সিঁড়ির ধাপ পার হতে হয়। সিঁড়ির ধাপের দুই পার্শ্বে পুরুত্ব বিশিষ্ট দেওয়ালের দেখা মেলে। এই দেওয়ালের উপরেও মার্লন ও ফোকর রয়েছে।

প্রাচীন জলদুর্গের বর্তমান ব্যবহার

প্রাচীন এই জলদুর্গ সমূহ যুদ্ধ পরিচালনা ও জলদস্যু প্রতিহত করার জন্যে প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমান এই দুর্গ অনেকটা অবহেলিত অবস্থায় পরে রয়েছে।  কয়েক দশক ধরে, দুর্গের অভ্যন্তরের সবুজ মাঠ স্থানীয় জনগণের খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উদাহরণ, স্বরূপ হাজীগঞ্জ দুর্গ ও সোনাকান্দা দুর্গ।  দুর্গের অভ্যন্তরে খেলাধুলা করা হয় বিধায় ছেলে ছোকরাদের কারণে দুর্গের অনেক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ইদ্রাকপুর দুর্গের অভ্যন্তরে ঔপনিবেশিক আমলের একটি পুস্কুরিনী রয়েছে বিধায় এই স্থান খেলাধুলা থেকে বিরত আছে। কিন্তু এই পুস্কুরিনীতে স্থানীয় লোকজন গোসলের কাজ করে। যেটা মেনে নেওয়াও একটা দুরূহ ব্যাপার।

খেলাধুলার পরিবেশ হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিধায় দুর্গের বুরুজ ও কামান স্থাপনার বেদী শৌচকার্যের জন্যে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া, প্রতিটা জলদুর্গের আসে পাশে গড়ে উঠা এক একটা নতুন স্থাপনা যেমন থাকার বাসস্থান, বিদ্যালয়, মসজিদ, ফ্যাক্টরি এসব কিছুই প্রাচীন জলদুর্গের সেটব্যাক নষ্ট করেছে। দুর্গের অভ্যন্তরভাগ যেন গবাদি পশু চারণভূমি।  অনেকেই তাদের পোষা গরু, ছাগল, ভেড়া দুর্গের অভ্যন্তরে সারাদিনের জন্যে ছেড়ে চলে যায়। পশুপাখির শৌচকার্যের আধার এই দুর্গ। কোথাও কোথাও দুর্গের দেওয়ালে নানা আঁকিবুঁকির অস্তিত্ব দেখা যায়। যে যা খুশি দেওয়ালের গায়ে লিখে রাখছে অশ্রাব্য সব কথা বার্তা। তাছাড়া কামান স্থাপনার বেদী, প্লাজা, মার্লন এসব কিছুর ভঙ্গুরতা ও বিবর্ণ দুর্গের অবস্থা আমাদেরকে এই দুর্গ সমূহ যে অবহেলিত সে কথা মনে করিয়ে দেয়।

শীতলক্ষ্যার পূর্ব তীরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ঐতিহাসিক সোনাকান্দা দুর্গ এখন আর কামান-গোলার শব্দে প্রকম্পিত হয় না। অনুরণিত হয় না এক একটি অন্তর। সোনাকান্দা এখন সরগরম মাইকের শব্দে। লাকি কুপনের টিকিট বিক্রি আর পুতুলনাচের জন্য এই প্রচার – প্রচারণা। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে এই দুর্গে বৈশাখি মেলা বসে। স্থানীয় বনানী চারুকারু শিল্পীগোষ্ঠী ১৯৯৮ সাল থেকে এই দুর্গের মাঠে মেলা বসিয়ে আসছে। তাদের দাবি, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই চলছে এ মেলা। তবে জেলা প্রশাসক বলছেন, তিনি এমন অনুমতি দেননি।

তিনটি দুর্গের মধ্যে হাজীগঞ্জ দুর্গ সর্বাপেক্ষা বহুবার সংষ্কার করা হয়েছে। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত ‘List of Ancients Monuments In Bengal” বইয়ের অধ্যায় অনুযায়ী এই দুর্গ ধ্বংস অবস্থায় ছিল। সেই সময় প্রতিরক্ষা প্রাচীর এবং একটি বুরুজ থাকার কথা বইতে উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে। ১৯৫০ সালে এই দুর্গের আবারো সংষ্কার হয়। প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তরের আওতায় এই সংষ্কার হয়।

ইদ্রাকপুর দুর্গকে ১৯০৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

Hajiganj Fort
হাজীগঞ্জ দুর্গের 3D ভিউ। মাধ্যম – Autodesk Revit Architecture

বহুল জনশ্রুতি প্রতিটা জল দুর্গকে ঘিরে হরেক রকম কল্পকাহিনী প্রচিলিত রয়েছে। এসব কল্পকাহিনী অবাস্তব মনে হলেও দুর্গ সংলগ্ন স্থানীয় জনগণের কাছে এইসব গল্প বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক। যুগ যুগ ধরে এইসব গল্পকে লালিত করে চলে আসছে লোকজন।

লোকগাঁথা ০১ সোনাকান্দা নামকরণ

সবচেয়ে প্রচলিত লোকগাঁথা হচ্ছে, বার ভূঁইয়াদের অধিপতি ঈশা খাঁ বিক্রমপুরের জমিদার কেদার রায়ের বিধবা কন্যা সোনা বিবিকে জোরপূর্বক অপহরণ করে এ দুর্গে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে, বিধবা সোনাবিবির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। এই বিয়েতে সোনাবিবির আপত্তি ছিল। সোনা বিবি সেই কষ্টে দুর্গে বসে রাত-দিন কাঁদতে থাকেন। সেই থেকে দুর্গের নাম হয়ে যায় সোনাকান্দা দুর্গ।

লোকগাঁথা ০২ঈশা খাঁ সোনাবিবির অমর প্রেম কাহিনী

সোনাকান্দা দুর্গ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে মর্মস্পর্শী একটি কাহিনী। সোনাকান্দা ছিল ঈশা খাঁর কেল্লা। মুঘলদের কাছ থেকে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে এই জলদুর্গ তিনি দখল করেন। বিক্রমপুর পরগনার রাজা কেদার রায়ের কন্যা স্বর্ণময়ী এসেছিলেন লাঙ্গলবন্দে পুণ্যস্নান করতে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে জলপানের জন্যে ঈশা খাঁ লাঙ্গলবন্দ ঘাটে যান। ইচ্ছে ছিল ব্রক্ষ্মপুত্র নদের জলসুধা নিজে পান করবেন, ঘোড়াকেও পান করাবেন। সেই সময়, স্বর্ণময়ী দেবীকে স্নানরত অবস্থায় দেখতে পান ঈশা খাঁ।  রাজকুমারী স্বর্ণময়ীর রূপ লাবণ্য ঈশা খাঁ কে আকৃষ্ট করেন। সেই থেকে তাদের প্রেমের শুরু।

একদল ডাকাত স্বর্ণময়ীর বজরায় হানা দেয়। প্রচুর স্বর্ণালংকারসহ স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করে। পরে ঈশা খাঁ তাঁকে উদ্ধার করে কেদার রায়ের কাছে ফেরত পাঠাতে চান। কিন্তু মুসলমানের তাঁবুতে রাত কাটানোয় জাত গেছে এ অভিযোগে কেদার রায় স্বর্ণময়ীকে আর ফেরত নেননি। একেতো বিধবা মেয়ে তার উপরে মুসলমানদের ঘরে রাত কাটিয়েছেন। এ খবর শুনে স্বর্ণময়ী কেল্লার তাঁবুতে দিনের পর দিন কেঁদে কেঁদে কাটিয়েছেন। আর তাই এর নাম হয় সোনার কান্দা বা সোনাকান্দা।

বিয়ের পরে হিন্দু ধর্ম থেকে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন স্বর্ণময়ী দেবী।তখন ঈশা খাঁ তার নাম রাখেন “সোনা বিবি”। খুব সুখেই দিন কাটছিলো ঈশা খাঁ ও সোনা বিবি দম্পতির। কেল্লার তাঁবুতেই তাদের দিন কাটছিলো।

এক সময় ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন রাজা প্রতাপাদিত্য ও তার ছেলে বিক্রম রায়। ঈশা খাঁ সোনা বিবি কে কেল্লায় রেখে যুদ্ধে যান। এই যুদ্ধে একটা মিথ্যে সংবাদ রটিয়ে দেয়া হয় যে ঈশা খাঁ যুদ্ধে মারা গেছেন। এই মিথ্যে সংবাদ কে সত্যিভাবে সোনা বিবি চিৎকার করে সোনাকান্দা গ্রামের বনের মধ্য দিয়ে ছুটে যান। বনের শুকনো পাতার মর্মর শব্দ ও বুঝি তার দুঃখে ভাগীদার হয়ে শব্দ করছিলো। এক সময় সোনা বিবি নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মাহুতি দেন। তার আর্তচিৎকারের জন্যে এই দুর্গের নামকরণ হয়ে যায় সোনাকান্দা দুর্গ।

লোকগাঁথা ০৩

সোনাকান্দা জল দুর্গের সঙ্গে সুড়ঙ্গপথে ঢাকার লালবাগ ও প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ের সংযোগ ছিল—এমন জনশ্রুতি ও আছে।

লোকগাঁথা ০৪

ইদ্রাকপুর দুর্গের সঙ্গে সুড়ঙ্গপথে ঢাকার লালবাগ দুর্গের সাথে সংযোগ ছিল—এমন জনশ্রুতি আছে।

ঐতিহাসিক জলদুর্গকে ঘিরে পর্যটন সম্ভাবনা

প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত রূপকথার রাজ্যপুরী আজকের নারায়ণগঞ্জ। অতীত-ঐতিহ্য ও ইতিহাসের ছোঁয়া এর প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অতি প্রাচীনকাল অর্থাৎ হিন্দু ও বৌদ্ধ যুগের স্থাপনা  কিঞ্চিৎ পরিমান হলেও সুলতানি, মুঘল, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ও স্বাধীনতা পূর্ববর্তী-পরবর্তী আমলের বহু নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা বহু চড়াই-উৎরাই পাড় করে টিকে রয়েছে এই নারায়ণগঞ্জে। তাছাড়া প্রাচীন কাল থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির স্থাপন করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোকেরা বসবাস করে আসছে এই নারায়ণগঞ্জে। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মুসলিম ও হিন্দু যে একসাথে বাস করে তার ও দেখা মেলে। তাইতো বিভিন্ন ধর্মের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা সহ সমাধি, মসজিদ,মন্দির, মঠ ও গির্জার দেখা মেলে। মধ্যযুগের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে রয়েছে প্রাচীন জলদুর্গ, মসজিদ, মন্দির, অভ্যর্থনাগার, খানকাহ, দরগাহ, সমাধি, শ্মশ্মান ঘাট, প্রাসাদ, রাজকীয় অট্টালিকা ও দরবার শরীফ। এসব স্থাপনার আকর্ষণ এখন সীমানা পেরিয়ে।  নারায়ণগঞ্জ ছাড়িয়ে বিভাগ, দেশ, কাল এর উর্দ্ধে। প্রতিদিন শত শত শুভানুধ্যায়ী ও পর্যটকের আগমন ঘটে এই স্থানগুলোতে। ধর্মীয় স্থানগুলো ধর্মীয় সাধনায় নিবেদিত লোকেদের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত হয়ে উঠে। এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের তীর্থস্থানগুলোতেও যাচ্ছে বিভিন্ন কাজের তাগিদে। ঐতিহাসিক এইসব  স্থাপনা দেখতে প্রচুর সংখ্যক বিদেশি পর্যটক নারায়ণগঞ্জ ভ্রমণ করেন। যদিও সব কিছুই পরিকল্পনা ছাড়াই চলছে।

তাই এখানে, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনার সামগ্রিক হাল হকিকত বিবেচনা করে নারায়ণগঞ্জকে ঐতিহাসিক পর্যটন নগরী হিসেবে ঘোষণা করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাছাড়া পর্যটনের মাধ্যমে আয় করা সম্ভব। এই আয় দিয়ে জলদুর্গের আদি অবস্থা টিকিয়ে রাখা ও ভবিষৎ রক্ষনাবেক্ষন করা সুনিশ্চিত।বর্তমানে টিকে থাকা, তিনটি জলদুর্গ নিয়ে হতে পারে হেরিটেজ ট্রেইল কিংবা ওয়াটার ট্রেইল। কেননা, তিনটা জলদুর্গ স্থলপথে ও জলপথে দুইভাবেই সংযুক্ত রয়েছে। নানাবিধ স্থাপত্য চিন্তা ভাবনার মধ্য দিয়ে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা তৈরী করা সম্ভব।

প্রস্তাবিত জলদুর্গ স্থাপনা

ঐতিহাসিক জলদুর্গগুলো  কে সংরক্ষণ করার জন্যে সরকার, মন্ত্রণালয়, প্রত্নতক্ত বিভাগ, স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থা সবাইকে একীভূত হয়ে কাজ করতে হবে। বহুকালের চড়াই উৎরাই পার করে প্রাচীন এই জলদুর্গ এখনো টিকে রয়েছে।  তবে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এই স্থানকে গড়ে তোলার জন্যে যুগোপযুগী চিন্তা ভাবনা করতে হবে। শুধু মাত্র একটি টিকেট কেন্দ্র ও অভ্যন্তরীণ ল্যান্ডস্ক্যাপিং করে দিলেই দায়সারা যাবে না। দুর্গের চারপাশের সেটব্যাক এখনো বেদখলে। এসব বেদখলের হাত থেকে দুর্গটিকে উন্মুক্ত করতে হবে। দুর্গের ভিতর ও বাহির সর্বত্র জুড়ে পর্যটকদের জন্যে কাজ করতে হবে। জলদুর্গকে ঘিরে ঘিরে হতে পারে এক একটি ফোর্ট কমপ্লেক্স। তাছাড়া দুর্গ সমেত অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে এর সাথে একত্র করে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাছাড়া সেটব্যাক এ অবস্থিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নতুন ঠিকানা কি হবে তা নিয়েও ভাবতে হবে।

উপসংহার

এক একটি জলদুর্গ নির্মাণ মানে এক একটি ইতিহাস রচনা করা। মুঘল আমলে ওপার বাংলার ন্যায় এপার বাংলাতেও এই নান্দনিক স্থাপনা তৈরী হয়েছিল। রচিত হয়েছিল ইতিহাস। অথচ আজ এই জলদুর্গ সমূহের অবস্থা বড়োই নাজুক ও অবহেলিত। প্রশাসন ও অধিদপ্তরের অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্বেও সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশ, এহেন কর্মকান্ড ও দুর্ব্যবহারের শিকার এই দুর্গ স্থাপনা সমূহ। কালের করালগ্রাসে ক্ষয়প্রাপ্ত আজকের এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। জলদুর্গ সমূহকে টিকিয়ে রাখার জন্যে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ যেমন জরুরি তেমনি সাধারণ মানুষের সচেতনাবোধ ও দরকার। সাধারণ মানুষের জলদুর্গের প্রতি ভ্রূক্ষেপ নেই। মানুষ নিজে ইতিহাস বিষয়ে সচেতন নয় বলে আজকের এই অবস্থা। প্রত্নতক্ত্য অধিদপ্তরে ও স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত বাঁচিয়ে দিতে পারে এই জলদুর্গ সমূহকে। এসব ইতিহাস খুব দ্রুত সংরক্ষণ জরুরি। কেননা আমাদের নতুন প্রজন্মের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে এই ইতিহাসকে। কোন জাতি ই তার ইতিহাস কে পেছনে ফেলে সামনের দিকে আগ্র্রসর হতে পারে না।

Contact No :: 01873461322, Gmail :: godhulylogonee@gmail.com

পূর্বের পর্ব

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.