গ্রামীণ জনপদের ঘরবাড়ি_ঘর-১৩

গ্রামীণ জনপদের ঘরবাড়ি_ঘর-১৩

 [লেখকঃ স্থপতি মাহফুজুল হক জগলুল, প্রধান স্থপতি, ইন্টারডেক সিস্টেমস, ঢাকা] 

শিল্পবোধের বিরোধ :

আতি ক্ষুদ্র আর সাধারন দুইটি মসজিদ আমি ডিজাইন করেছিলাম আমাদের পিরোজপুর অঞ্চলের প্রত্যন্ত দুটি গ্রামে। মোটেও কোন উল্লেখ করার মতো ডিজাইন না, নিতান্তই মামুলি সাধারণ কাজ। শুধু ডিজাইন নয় এর কনস্ট্রাকশনের সাথেও আমি মোটামুটি জড়িত ছিলাম।

প্রথম মসজিদটি ডিজাইন করি ২০১৬ সালে কালিগঙ্গা নদীর একদম পাড়ে চরেরবাড়ি নামের প্রচন্ড দরিদ্র ও প্রায় অচ্ছুৎ জনগোষ্ঠীর একটা জেলে পাড়ায়, মসজিদ ও মক্তবের অনুপস্থিতির কারনে বয়স্ক অনেক লোকও এখানে নামাজ পর্যন্ত পড়তে জানতো না। স্থানীয় কিছু লোকদের অনুদানে এই মসজিদটি নির্মাণ করে প্রধানত সেই সব প্রায় অচ্ছুৎ জেলেরা। এলাকার অনেক ‘ জ্ঞানী ও ধর্মীয় পন্ডিত মানুষেরা ‘ আমাকে বলেছিলেন যেএইসব চরম অশিক্ষিত নীচু শ্রেনীর ‘ জাউল্লাদের ‘ জন্য মসজিদ বানানোর কোন দরকার নাই,……
“এইহানে মসজিদ বানাইলে হেয়া ৬ মাস পর খালি পইরগা থাকবে , তহন হারিকেন জ্বালাইয়াও কোন নামাজি খুইগা পাবেন না নে। মসজিদে ঘুঘুতে বাসা বাইনগা ডিম পাড়বে আনে।”
তাদের কথায় আমার মাথায় জেদ চেপে যায়,আমি ঠিক করি মসজিদ এখানেই বানাতে হবে, ওই সব জাউল্লারা সংগঠিত হয় এবং এই কথার পর তাদের মাঝে সংহতি আরো অনেক গুন বেড়ে যায় ……. ঐ অজ পাড়ায়ই প্রায় ১৭’ মজা ডোবা ঐ অশিক্ষিত ও তথাকথিত বেনামাজি অচ্ছুৎ জেলেরা স্বেচ্ছাশ্রমে নদীর চর থেকে মাটি কেটে এনে ভরাট করে স্থানীয় ও অস্থানীয় অনেকের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করে এনে ওখানেই ছোট্ট মসজিদটি বানায় , কিন্তু….. God has His own mysterious ways….. যে প্রধান মাতুব্বর জেলেপাড়ার মসজিদ বানানোর প্রাধান বিরোধী ছিলেন এবং যার মুখ দিয়ে জেলেদেরকে নিয়ে উপেক্ষা আর তাচ্ছিল্যের সবচেয়ে রূঢ় বাক্যগুলি বের হয়েছিল তার বাড়ন্ত কিশোর ছেলেকেই দেখা গেলো বাবার অগোচরে সারাদিন জেলেদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মসজিদের জন্য স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি কাটছে…… দেখতে দেখতে তাদের সাথে যুক্ত হয়ে গেলো ৫/৭ গ্রামের ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে শিশু থেকে ৯০ বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত প্রায় ৩০০/৪০০ মানুষ…… সে এক এলাহি কান্ড…… এক মহা উৎসবের, মহামিলনের কর্ম ও প্রার্থনার অপূর্ব কলরবমূখর এক মহা আনন্দযজ্ঞ। আমার জীবনে এমন বিস্ময়কর এবং অভুতপূর্ব আনন্দমূখর পবিত্র অভিজ্ঞতা খুব কম হয়েছে।

সেই সব পন্ডিতদের কথা ভুল প্রমান করে এই মসজিদটি এখন এলাকার অন্যতম প্রধান মসজিদে পরিনত হয়েছে,……. আলহামদুলিল্লাহ, হারিকেন দিয়ে নামাজি খুজতে হয় না, বিশেষ করে নদীর একদম পাড়ে হওয়ায় নৌপথে চলাচলকারী বহু মানুষ মসজিদের ঘাটে নৌকা আর ছোট ছোট জাহাজ ভিড়িয়ে নামাজ আদায় করে।

“এইসব প্রান্তিক গ্রামীণ মানুষদেরও তো আছে হাজার বছরের চর্চিত নিজস্ব শিল্পসাহিত্য, সঙ্গীত, দর্শন, চিন্তাচেতনা ও নান্দনিক বোধ। আমি এত সিওর কি করে হচ্ছি যে আমার বোধ টাই একমাত্র উন্নত বোধ আর এদের কোন নিজস্ব ভিন্ন বোধ থাকতে নেই? কোনটা সঠিক শিল্পবোধ আর কোনটা সঠিক শিল্পবোধ নয় তা আমি প্রমাণ করব কিভাবে?”

দ্বিতীয় মসজিদটি ডিজাইন করি ২০১৭ সালে উদয়কাঠি গ্রামের ডেপুটি বাড়ির পাশে,স্থানীয় গ্রামবাসীরা নানা জায়গা থেকে অনুদানের টাকা জোগাড় করে এটা নির্মাণ করে।

আমার লেখার উদ্দেশ্য মসজিদ স্থাপত্যের বর্ননা বা কোন ধর্মীয় প্রচার প্রচারনা নয়, আমার আলোচনার বিষয় আধুনিক স্থাপত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ( With syllabus made in North America) একজন স্থপতি হিসেবে আমার ও সাধারণ গ্রামবাসীর মধ্যে শিল্পবোধ অথবা অন্যভাবে বললে Aesthetics এর বিরোধের ঠান্ডা লড়াই নিয়ে।

আমার দুটি মসজিদের ডিজাইনই ছিল ব্রিক পয়েন্টেড ফ্যাসাদের। যদিও এলাকার ইটের কোয়ালিটি খুব ভালো ছিল না তবুও কাজ শেষ হবার পর একটা আত্ম তুষ্টি অনুভব করলাম যে কিছু ব্রিক পয়েন্টিংয়ের কাজ এই অজ পাড়াগাঁয়েও করা গেলো। তবে কাজের শেষের দিকেই গ্রামের লোকজন খুব বিনয় গদগদ ভাব দেখিয়ে মৃদু গুনগুন আপত্তি করছিল এই প্লাস্টারহীন ব্রিকপয়েন্টেড বাইরের দেয়াল ও রং বিহীন প্লাস্টার্ড রেলিং নিয়ে। তাদের আর আমার সেই কথোপকথন মোটামুটি একটা নমুনা দেই :
‘ ভাইজান, ইটে রং দিবেন না? খয়েরী লাল রং দিলে খুব চমেৎকার হইতে, নীলা দিলেও মন্দ হইতে না, অনেক দূর দিয়া দেহা যাইতে ‘
আমি শিউরে উঠলাম, ‘ ভাইজানে ‘ কয় কি……..আমি অনেক কষ্টে মাথা ঠান্ডা রেখে বললাম,
না, রং দিলে চারিদিকের এই সবুজ গাছপালার মধ্যে জ্বলজ্বল করবে, চোখে লাগবে, এমনই থাকুক, প্রকৃতির সাথে মিশে থাকবে,ভালো লাগবে…….একটা বিনীত ভাব থাকবে ।’

ভাইজান কি যে কন, এইডা ক্যামন মাইড্ডা মাইড্ডা দেহায়, মানষে কইবে কি
‘আমি বললাম,এইটা আপনি বুঝবেন না, এইটাই ‘ মডার্ন ডিজাইন ।
কয়েকদিন পরে জেলে পাড়ার দুলাম মিয়া আরো সাহস করে বললো,’ দাদা, বেয়াদবি না নিলে একটা কথা কই ‘আমি বললাম, কন।’ দাদা, ইটের উপর কালার না দিলে ক্যামোন ল্যাংডা ল্যাংডা লাগে ‘আমি কিছুটা রাগত স্বরে বললাম, এ ব্যাপারে আর কথা বলতে চাই না।’ যে দাদা, ঠিক আছে, ভুল হইয়া গেছে, মাপ কইরা দিয়েন, আর কমু না, তয় শেওলা পইরা কালা কালা হইয়া যাইবে আনে, মসজিদ হওন উচিত চকচকা….. বাদ দ্যান, চলেন দুপুরে আমার ঘরে আইজ খাবেন, আপনের জন্য আধা হাত লম্বা গাংগের জ্যাতা শলা চিংগইরের ছালুন রানছি ‘আমি বললাম,তাই ভালো, চলেন ইটের রংগের আলাপ বাদ দিয়া খইতে খাইতে চিংগইর মাছের ছালুনের রংগের আলাপ করি।দুলাল খান দাঁত কেলাইয়া হাসতে হাসতে আমাকে তার ঘরে খেতে নিয়ে গেলো…… আমি ভেবেছিলাম তাদের সাথে আমার এই জটিল আর্কিটেকচারাল বিরোধ পর্ব নানান পদের রসনা উদ্দীপক আহার্য পর্বের মাধ্যমে এখানেই শেষ হয়ে যাবে।কিন্তু আমার বুঝতে ভুল হয়েছিল…..তারা এ নিয়ে আমার সাথে আর কথা বলে নাই…… কিন্তু মুখে বললেও তারা আমাকে ‘ মাপ ‘ ( মাফ) করে নাই…….কেননা সব ব্যাপারে আনুগত্য দেখালেও তারা আমার সৌন্দর্যবোধ বা শিল্পবোধ মোটেও গ্রহন করেতে রাজি না।

জিনিসটা হাড়েহাড়ে টের পেলাম বছর খানেক আগে যখন এই দুটি মসজিদের কিছ low resolution ছবি অন্য সূত্রে আমি হাতে পাই…… ছবিগুলো দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই……. এ কোন মসজিদ?……. স্তম্ভিত হবার আর একটা প্রধান কারন এরকম চুপিচুপি অবাধ্য হতে আমি ওদের কখনো দেখি নাই…..ছবিগুলো দেখে নিজের ডিজাইন আমি নিজেই চিনতে পারছিলাম না। গত কয়েকমাসের মধ্যে আমার লম্বা অনুপস্থিতিতে গ্রামবাসীরা মসজিদের ব্রিক পয়েন্টিংয়ের দেয়াল ও রঙবিহীন প্লাস্টার করা ডিজাইন এলিমেন্টগুলো সম্পুর্ন ‘ ক্যাটক্যাটে ‘ ( আমার দৃষ্টিতে) নানা রংগের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছে। ছবিগুলো দেখে রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিলো। চরেরবাড়ির মসজিদের ব্রিক পয়েন্টেড ফ্যাসাদের উপর করা হয়েছে ক্যাটক্যাটে উজ্জ্বল খয়েরী লাল রঙ আর প্লাস্টার্ড ফেয়ার ফেস রেলিংয়ের উপর লাল,নীল, হলুদ,সবুজ,বেগুনি নানা রঙের জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। ইটের পয়েন্টিং এর উপর যত্ন করে সাদা সরু লাইন আঁকা হয়েছে।ডেপুটি বাড়ির মসজিদের রঙ করা হয়েছে উজ্জ্বল আকাশী আর একই ভাবে ইটের পয়েন্টিং এর উপর যত্ন করে সাদা সরু লাইন আঁকা হয়েছে। এছাড়া মসজিদের পিছনে মেহরাবের ছাদের উপর একটা কিম্ভূতকিমাকার সুরু মিনার বানানো হয়েছে আর তাতে চকচকে টাইলস লাগানো হয়েছে।

এছাড়া আমাদের গ্রামে আমি একটা ছোট্ট একটা দাতব্য স্বাস্থ্য ক্লিনিক ডিজাইন করেছিলাম অনেক বছর আগে, সেটাও ছিল ব্রিক পয়েন্টেড ফ্যাসাদের……… আমার অভিজ্ঞতায় দেখলাম, এই ব্রিক পয়েন্টেড ফ্যাসাদই যত ফ্যাসাদের মূল……. গ্রামের মুরুব্বিরা প্রায়ই আমাকে অনুরোধ জানায় আমি যেন ওই ইটের উপর ‘ নীলা ‘ ( যে কোন বিচিত্র কারনেই হোক বেশির ভাগই মানুষই এখানে নীল বলতে সবুজ রঙ বোঝায় ) রঙ করার অনুমতি দেই, বিল্ডিংয়ের উপর আমাদের পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থাকায় এটা তারা এখনো করে উঠতে পারে নাই…. ভয়ে ভয়ে আছি কবে গিয়ে দেখবোসেটা ‘ নীলা ‘ রঙ করা হয়ে গেছে।এটা আমার নিজের পিতৃপুরুষের এলাকা হবার কারনে ও মসজিদের সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত হবার প্রেক্ষাপটে এই দুটি মসজিদের সাথে আমার সম্পর্ক এমন যে মসজিদে ইফতারিতে জনপ্রতি কয়টা করে খেজুর দেয়া হবে তাও ফোনে আমাকে ঢাকা থেকে বলে দিতে হয়। মসজিদের ইমাম সাহেবের ইন্টারভিউও আমাকে নিতে হয়।মোদ্দা কথা মসজিদের কোন কিছুই এরা আমকে না জানিয়ে করে না। সেই একই মানুষগুলো আমি চরম অপছন্দ করবো জেনেও এবং আমার নিষেধ থাকা সত্বেও কেন এই কাজ করলো? আমি খুব গভীর ভাবে জানি গ্রামের এই মানুষগুলো আমাকে পচন্ড ভালোবাসে ও আমার মতামতের সন্মান করে, আমার জন্য এদের অনেকে যে কোন কাজ করতে রাজি তবুও এতো কিছুর পরেও তারা কিন্তু কিছুতেই আমার সৌন্দর্যবোধ বা শিল্পবোধ গ্রহন করতে রাজি হলো না কেননা তাদের তাদের সৌন্দর্যবোধের নিজস্ব কাঠামো আছে …….

প্রাথমিক ভাবে ঘটনাটা আমি খুব ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নিলেও পরে জিনিসটা আমি খুব ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করেছি।এইসব প্রান্তিক বা গ্রামীণ মানুষদেরও তো আছে হাজার বছরের চর্চিত নিজস্ব শিল্পসাহিত্য, সংগীত,দর্শন,চিন্তাচেতনা ও নান্দনিকবোধ। আমি এতো সিওর কি করে হচ্ছি যে আমার বোধটাই একমাত্র উন্নত বোধ আর এদের কোন নিজস্ব ভিন্ন বোধ থাকতে নেই? কোনটা সঠিক শিল্পবোধ আর কোনটা সঠিক শিল্পবোধ নয় তা আমি প্রমান করবো কি ভাবে? এটা তো কো ফিজিক্স বা গনিতের বিষয় নয় যে আমি যোগ, বিয়োগ, গুন ভাগ করে সমীকরণের শেষে অকাট্য ভাবে প্রমান করে দিতে পারবো যে আমার Aesthetics ই উত্তম আর তদের Aesthetics টা নিম্নস্তরের। তারা তো আমাকে জোর করে ফকির সিরাজ সাঁই বা বাউল সাধক জালালুদ্দিন খাঁ বা অপেক্ষাকৃত নবাগত শেখ রাজ্জাক বয়াতির গান শোনাতে চায় না তবে আমি কেন তাদের গলায় পাড়া দিয়ে তাদের গলা দিয়ে নগরের ক্লাসিকাল রাগ রাগীনী বা ভিনদেশী জ্যাজ গাওয়াতে চাচ্ছি? তারা তো আমার জ্যাজ শুনতে চাচ্ছে না।এই ঘটনার পরে আমি আর একবার মাত্র গ্রামে গেছি এবছর ফেব্রুয়ারী মাসে, করোনার কারনে ফেব্রুয়ারী মাসের পর আর এলাকায় যেতে পারি নাই। তবে প্রত্যেকবার যেমন এলাকায় গেলেই ওরা যেমন আমাকে মসজিদে নিয়ে যায় নৌকায় করে এবার ওদের মধ্যে দেখলাম একটা ভয় ভয় ভাব আমার মধ্যেও ছিল একধরনের বিব্রতকর মানসিকতা……আমরা দু পক্ষের কেউই এই শিল্পবোধের সংঘাতের আশু বিরোধজনিত মনোমালিন্যের অস্বস্তিকর অবস্থা ফেস করতে চাইনি। এখানে যেমন আপোষ করা কঠিন আবার যুগ যুগের মমতাময় ব্যক্তিগত সম্পর্ককে আঘাত করা আরো কঠিন ও বেদনাদায়ক। তাই আপাতত যুদ্ধবিরতি……..একটা চরম শিক্ষা আমার হয়েছে যে আমার নগরের মনস্তত্ত্ব নির্ভর নান্দনিক বোধই চুরান্ত নয় এবং আমাকে অন্য মাত্রা ও পরিবেশে বেড়ে ওঠা শেকড়াশ্রয়ী নান্দনিক বোধকেও যথাযথ সন্মান করতে শিখতে হবে ও স্বীকৃতি দিতে হবে……. এ স্বীকৃতি দেবার মধ্যে বিনয়ের ভানিতা থাকলে হবে না বরং তা যথার্থই আন্তরিক ও মৌলিক হতে হবে।

এখানে আমি নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক,বেলজিয়াম ও গ্রিসের গ্রামাঞ্চলের গ্রামবাসীদের নিজেদের বানানো কিছু বাড়িঘরের ছবি দিলাম…… এগুলোর প্রায় সব গুলোই নানা তথাকথিত ক্যটক্যাটা উজ্জ্বল রঙে ঝলমল করছে কিন্তু এগুলোকে সেদেশের স্থপতি ও শিল্পীকুল আপন করে নিতে কোন দ্বিধা করে না বরং টুরিস্টদের তারা ডেকে এনে তাদের ঐতিহ্য হিসেবে এইসব রঙিন ঘরবাড়ি দেখিয়ে গর্বিত বোধ করে। অবশ্যই সেখানে নগরের ভিন্নতর স্থাপ্তত্য রীতি আছে কিন্তু সেই রীতির সাথে গ্রামীন বা তাদের প্রাচীন রীতির মধ্যে ওমন আকাশপাতাল তফাত নেই যা আমাদের সমাজে আছে আর নেই গ্রামীণ শিল্পবোধের প্রতি আমাদের মতো এমন উন্নাসিকতা ও উদগ্র অবহেলা।

আগের লেখায়ও আমি বলেছি যে আমাদের সমাজের মতো পৃথিবীর আর কোন সমাজে নাগরিক ও গ্রামীণ সংস্কৃতি ও রুচিবোধের মধ্যে এমন সুতীব্র বিভাজন ও দূরত্ব খুব সম্ভবত আর কোথাও নেই, তাই এব্যাপারে মৌলিক চিন্তাভাবনা ও গবেষনা দরকার বলে মনে করি। গ্রামীন মৌলিক এই শিল্পবোধ বা শিল্পচেতনা (স্থপত্যও যার একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ) আমাদের সন্মানের সাথে বিবেচনায় নিয়ে একটা বিশাল পরিসরের সাংস্কৃতিক ওরিয়েন্টেশন ও সিনথেসিসের চিন্তাভাবনার খুবই প্রয়োজন বলে আমি অনুভব করি। আমার এ অনুভব অন্য সকলের কাছে গুরুত্ববহ নাও হতে পারে এবং সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি অন্তত আমার আছে।

গ্রামের মানুষ কর্তৃক এই মসজিদ দুটির ব্রিকপয়েন্টেড ফ্যাসাদসের উপর তাদের ইচ্ছে মতো ঐ রঙ করার ঘটনাদ্বয়কে কেন্দ্র করে আমি আমার এই জটিল অনুভূতি ও এই শিল্পবোধ বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার পুনরাবিষ্কারের অভিজ্ঞতা এ লেখার মাধ্যমে সঠিকভাবে বোঝাতে পেরেছি কিনা তা আমি নিশ্চিত নই। আমার এই অভিজ্ঞতা বা thought experiment কে অনেকের কাজে খুবই হাস্যকর ও লঘু একটা ব্যাপার বা লেখার অযোগ্য বিষয় বলে মনে হতে পারে….. তাদের সেরকম মনে করারও ১০০% অধিকার আছে। তবে আমার এই অভিজ্ঞতার ধাক্কার ফলশ্রুতিতে আমার মনোজগতে চিন্তার ক্ষেত্রটা যে বিশাল ওলট-পালট হয়ে গেছে, জীবনের এই স্টেজে এসে আমি সেটা শেয়ার করাটা খুব জরুরী বলে মনে করেছি বলে এই লেখাটা লিখেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *