গ্রামীণ জনপদের ঘরবাড়ী_ঘর-৭

গ্রামীণ জনপদের ঘরবাড়ী_ঘর-৭

[লেখকঃ স্থপতি মাহফুজুল হক জগলুল, প্রধান স্থপতি, ইন্টারডেক সিস্টেমস, ঢাকা]
১ম পর্বের লিঙ্কঃ https://tinyurl.com/y257mwa2
২য় পর্বের লিঙ্কঃ https://tinyurl.com/y46qkmcm
৩য় পর্বের লিঙ্কঃ https://tinyurl.com/y3ugtyna

অনেকেই গরীবমার্কা ছিন্নভিন্ন পাখির বাসার মতো ‘ নোংরা ‘ হতদরিদ্র ঘর দেখতে দেখতে ক্লান্ত….. আমাকে অনেকে বলেছে আমাদের গ্রামে সুন্দর সুন্দরও তো অনেক ঘর আছে, আছে শত শত বছরের গ্রামীণ ঘরবাড়ির ঐতিহ্য ও ইতিহাস, সেগুলোও মাঝেসাঝে আলোচনা কেন করি না? তাদের কথায় অবশ্যই যুক্তি আছে।

আসলেই কত আর ভালো লাগে এইসব ভাংগা নোংরা বাড়িঘর দিনের পর দিন দেখতে …… আসলেই দারিদ্র্য খুব দৃস্টিকটু জিনিস…. হুমায়ুন আজাদের বিখ্যাত সেই ‘ গরীবের সৌন্দর্য ‘ কবিতাটির কথা মনে পড়ে যায়:

” গরিবেরা সাধারণত সুন্দর হয় না।
গরিবদের কথা মনে হ’লে সৌন্দর্যের কথা মনে পড়ে না কখনো।
গরিবদের ঘরবাড়ি খুবই নোংরা, অনেকের আবার ঘরবাড়িই নেই।
গরিবদের কাপড়চোপড় খুবই নোংরা, অনেকের আবার কাপড়চোপড়ই নেই।
গরিবেরা যখন হাঁটে তখন তাদের খুব কিম্ভুত দেখায়।
যখন গরিবেরা মাটি কাটে ইট ভাঙে খড় ঘাঁটে গাড়ি ঠেলে পিচ ঢালে তখন তাদের
সারা দেহে ঘাম জবজব করে, তখন তাদের খুব নোংরা আর কুৎসিত দেখায়।
থুতু ফেলার সময় গরিবেরা এমনভাবে মুখ বিকৃত করে
যেনো মুখে সাতদিন ধ’রে পচছিলো একটা নোংরা ইঁদুর।…………
অর্থাৎ জীবনযাপনের কোনো মুহূর্তেই গরিবদের সুন্দর দেখায় না।
শুধু যখন তারা রুখে ওঠে কেবল তখনি তাদের সুন্দর দেখায়। “

গরীবদের শুধু রুখে দাড়ালেই সুন্দর লাগে….. গ্রামীণ গরীব মানুষের আবাসন উন্নয়নের আন্দোলনে রুখে দাড়াতে স্থপতিদের এখন হতে হবে তাদের সহযোগী শক্তি।

আসলে সমাজের ক্ষমতাসীন এলিট বা অধিপতি শ্রেণীর শিল্প , সাহিত্য,সংগীত, স্থাপত্য সহ সকল সুকুমারকলার ইতিহাসই প্রমিত ইতিহাস, প্রান্তিক মানুষের ইতিহাস যেন ইতিহাস নয়। মানুষ সম্রাট শাহজাহানকে স্মরণ করে তাজমহল কিম্বা আগ্রা ফোর্টের চমৎকার স্থাপত্যের জন্য কিন্তু এই একইসময়ে আগ্রা বা দিল্লিতে যে অগুনিত প্রান্তিক মানুষ চরম মানবেতর অবস্থায় বসবাস করতো তাদের সেই হতদরিদ্র ভাংগা ঘরের স্থাপত্যের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে কেউ উৎসাহী নয়, কেননা প্রচলিত মনস্তত্বত্তে সেটা স্থপত্যের ইতিহাসের অংশ নয়।

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে ঢাকায় যখন বিশাল আলিসান লালবাগ কিল্লা বানানো হচ্ছিলো, বা গত শতাব্দীর একদম প্রথম দিকে যখন অক্সফোর্ডের আদলে সুরম্য কার্জন হল বানানো হচ্ছিলো বা মধ্য ষাট দশকে লুই ইসাডোর কান যখন চরম নিবর্তনমূলক আইয়ুবি সামরিক শাসনের মধ্যে শূন্য গণতন্ত্রের দেশে বিশাল আকৃতির গণতন্ত্রের ভবন বানাচ্ছিলেন বা এখনো যখন ৪ বিলিয়ন ডলারের পদ্মা ব্রিজ বানানো হচ্ছে তখনও গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষের আবাসনের প্রায় সেই একই অপরিবর্তিত করুন হতদরিদ্র অবস্থা, এ খাতে তেমন কোন পরিবর্তনই হয় নাই বা এ নিয়ে তেমনভাবে কেউ চিন্তিতও নয়, আর সবচেয়ে ভয়ানক হলো আমাদের এই নাগরিক মনস্তত্ত্ব যা গ্রামীণ মানুষের ন্যায্য আবাসন প্রদানের ব্যর্থতার জন্য এই শাসকদের মোটেও দায়ী করছে না বরং এইসব বিশাল আর সুরম্য নাগরিক স্থাপত্য সৃস্টির জন্য তাদের শাসনামলকে গ্লোরিফাই করছে, কেননা অধিপতি শ্রেনীর নির্ধারিত স্থাপত্যের ইতিহাসই প্রমিত ইতিহাস, প্রান্তিক মানুষের আবাসনের হতদরিদ্র চিত্রের আলোচনা বিশুদ্ধ শিল্পচর্চার মধ্যে যেন একধরনের ‘ ভেজাল টাইপ ফালতু ঝামেলা’।

আমাদের ইতিহাসের ভালো-মন্দ নির্ধারণের যে বৈচারিক মনস্তত্ত্ব সে মানদণ্ডে আমরা তাজমহলের জন্য সম্রাট শাহজাহানকে ও কার্জনহলের জন্য লর্ড কার্জনকে গ্লোরিফাই করে কিন্তু লক্ষ কোটি গরীব মানুষের আবাসনের প্রতি অবহেলার জন্য সম্রাট শাহজাহান বা লর্ড কার্জনকে অভিযুক্ত করিনা।

অবশ্যই নিঃসন্দেহে গ্রামীন সম্ভ্রান্ত ঘরগুলোও আমাদের গ্রামীণ স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংগ। এবার আমাদের এলাকার একটা বনেদী ৩ তলা কাঠের ঘরের সম্বন্ধে বলি।

খান বাড়ি, গ্রাম,পুখুরিয়া, পিরোজপুর

ঘরটি আমাদের এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী, সন্মানিত ও শিক্ষিত পরিবারের ঘর। সরকারী সচিব, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান, বড় ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সমাজে অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা এই ঘরে জন্ম নিয়েছেন। জনাব সইয়েদুদ্দীন খান সাহেব দক্ষিনমুখী এই ঘরটি নতুন করে বানান বাংলা ১৩৫৮ সনে, সে হিসাবে ঘরটির বয়স প্রায় ৬৭ বছর। আজ পর্যন্ত ঘরের একটি খুটিও পরিবর্তন করতে হয় নাই, বাইরের পার্টিশনের কাঠের সামান্য কিছু অংশ কখনো সখনো বদলাতে হয়েছে।

উচ্চতায় ঘরটি প্রায় ৩১’ উঁচু। ঘরটির কোনার খুটি সব পাকা শাল কাঠের ,অন্যান্য খুটিগুলো পাকা কড়ই কাঠের।খুটির সাইজ ৪’X৩.৫”। চারিদিকের সব খুটি ১৩.৫ হাত লম্বা। সম্পুর্ন ঘরের শীর্ষ উচ্চতা প্রায় ২১ হাত। সারা ঘরে নানারকমের কাঠের কারুকাজ শোভিত বিশেষ করে চতুর্দিকের টানা বারান্দার কাঠের গ্রিলের ডিজাইনে ও অন্যান্য ঝুলন্ত এলিমেন্টে।

ঘরের প্লিন্থ ইটের উপর নিট সিমেন্ট ফিনিসের তবে খুব চকচকে । যেহেতু এ ঘরের মানুষরা অনেক জনসম্পৃক্ত ও অনেকেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তাই ঘরের সামনের ৭’ চওড়া লম্বা বৈঠখানা নানারকম মানুষে গম গম করে সারাদিন। সামনের বারান্দায় আগত জনসাধারনের বসার জন্য প্লাসটার করা ইটের সোফার আকৃতির বসার ব্যবস্থা আছে ,স্থানীয় ভাষায় একে বলে ‘ আলিশ্যা ‘। এ রকম ইট সিমেন্টের আলিশ্যা ছোট বড় অনেক ঘরের সামনেই দেখা যায়।এখানে আর একটি মধ্যম শ্রেনীর গৃশস্থের ঘরের ছবি দেয়া হয়েছে এই ঘরেরও আগত মানুষদের বসার জন্য অন্যরকম আলিশ্যা আছে আছে যা মাটির তৈরি।

ঘরের এন্ট্রিটাও রাজকীয়………তিনটা বিশাল রংগিন ফোল্ডেড দরোজা এন্ট্রিতে বহু মানুষের সমাগকে স্বাগত জানাচ্ছে প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত । গ্রামে বা এমনকি শহরেও এরকম বড় বড় তিন তিনটি বড় ফোল্ডেড এন্ট্রি দরোজা খুবই বিরল। এছাড়াও ঘরের সামনের দিকে অর্থাৎ দক্ষিন দেয়ালে আছে মোট ৪টি বড় জানালা। তারমানে ৩টি ফোল্ডেড দরোজা ও তার সাথে ৪টি জানালার কাঠের কপাট খুলে দিলে সামনের উঠানের সাথে সামনের বৈঠকখানা মিলেমিশে প্রায় একাকার হয়ে যায় এবং আগুনিত আগত মানুষের সাথে ঘরের সদর অংশের আর কোন বাধা থাকে না, এমন একটা কোলাহলমুখর প্রাণবন্ত বাধাহীন স্পেস নগরের কোন বসত বাড়িতে চিন্তাই করা যায় না। পুরো ঘরটার মধ্যেই একটা সুস্পষ্ট ইনভাইটিং আবেদন আছে যা নগরের উঁচু দেয়াল ঘেরা বড় বড় কঙ্ক্রিটের বাড়ির মতো মানুষকে ভয় দেখায় না বা দূরে সরিয়ে দেয় না। দোতলার আশ্চর্য সুন্দর বারান্দাটা চারদিকেই সমানভাবে বিস্তৃত, বিনা বাধায় এই বারান্দার চারদিক চক্রাকারে হাটা যায়।সবচেয়ে মজার হলো ৫’ চওড়া বারান্দাটা পুরাপুরিই একটি কাঠের ঝুলন্ত ক্যান্টিলিভার স্ট্রাকচার। এই চতুর্মুখী ঝুলন্ত বারান্দাই ঘরটিকে এক অনিন্দ সুন্দর ত্রিমাত্রিক আবয়ব দিয়েছে যা এক কথায় অপূর্ব। বারান্দার রেলিংয়ের ডিজাইনের নিখুঁত কাঠের কারুকাজ ও কারুকাজের ফাঁক দিয়ে আলোছায়ার খেলা এক বিচিত্র সুন্দর শিল্পময় পরিবেশ তৈরি করে। চালের নিচে বাঁশে বেড়ার লেয়ার সাঁটা থাকায় উপরের টিনের চালের গরম অনেক কম লাগে। বড় বড় জানালায় গ্রিল হিসাবে পাকা শাল কাঠের ভার্টিক্যাল চারকোনা ( প্রায় ১” X ১” সেকশন ) কোনাকোনি করে বসানো হয়েছে যাতে অপটিক্যালি দন্ডগুলোকে ওন্য অন্য রকম মনে হয় ও ঘরের হালকা ভাবটা নস্ট না হয়।

ঘরটার দোতলায় একটা আধুনিক টয়লেট আছে, এর আগে আমি আর কোন কাঠের ঘরের দোতলায় টয়লেট দেখিনি।

ঘরের সামনে পুবদিক ঘেঁষে প্রাচীন পারিবারিক কবরস্থান ও বিরাট সম্মুখ উঠান যা নিয়মিত বিভিন্ন কাজে আসা মানুষে পরিপূর্ণ থাকে। পিছনেও বিশাল উঠান, রান্নাঘর ও ঘাটওয়ালা পুকুর, দাউর ঘর…… এটা প্রধানত মহিলা মহল।

সামনের বারান্দার vertical element গুলো বেশ সুনিপুন কারুকাজ শোভিত, সাদামাটা কাঠের চৌকোনা কাঠের খুটি না। ৫’ ঝুলন্ত বারান্দার সাপোর্টের জন্য যে কাঠের ক্যান্টিলিভার রিব ব্যবহার করা হয়েছে তা জোড়ায় জোড়ায় করা হয়েছে ,দুই জোড়ার মাঝখানে কিছুটা গ্যাপ থাকায় নিচ থেকে কাঠের রিবগুলো খুব vibrant feature মনে হয় এবং তা একটা অনন্য আবহ তৈরি করে।

সে সময়ের বিখ্যাত কাঠের ঘরের কারিগর রাজেন মাঝি নিজের ডিজাইনে ও নিজের হাতে করা এই অনিন্দ্য সুন্দর মজবুত তিনতলা কাঠের ঘরটি। এই ঘরটি যখন সে বানায় তখন তার বয়স ৩০ বছর। সে অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল, অর্থাভবে আর পড়তে পারেনি। রাজেন মাঝি আজ বেঁচে নেই,২০০৭ সালে ৮৫ বছর বয়সে সে মারা যায় , তবে তার পুত্র শংকর মাঝি এখনো আমাদের এলাকায় একই কাজে নিরন্তর নিয়োজিত আছে, তার রক্তধারায় রাজেন মাঝির শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতা আজও বয়ে চলে তবে যেহেতু নব্য ধনবানরা কাঠের ঘরের চেয়ে লাল নীল সস্তা টাইলস শোভিত ইটের বিল্ডিং বানিয়ে তাদের অর্থশক্তি ও পেশিশক্তি প্রদর্শনে বেশি আগ্রহী তাই কাঠের স্থাপত্যের এই ধারাটি ক্রমশই হারিয়ে যেতে বসেছে। সৃষ্টিশীল স্থাপত্যের জন্য রুচিবান ক্লাইন্ট ও তার আর্থসামাজিক মনস্তত্ত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।

আলোচ্য ঘরটির ত্রিমাত্রিক অবয়বের একটা খুব ইন্টারেস্টিং অনুষঙ্গ হলো ঘরের প্রায় চূড়ায় মুকুটের মতো একটা ত্রিকোন Attic স্পেসের ঢালু চাল। এই স্পেস থেকে বাইরে তাকানোর জন্য রংগিন কারুকাজময় রেলিংযুক্ত জানালা আছে যা একে আরো নাটকীয় করে তুলেছে।পশ্চিমা জগতে এমন এটিক চাল থাকে কিন্তু সেগুলো সাধারণত হয় দোচালা, কিন্তু ছবিতে খেয়াল করলে দেখা যাবে এই এটিকের চাল তিনচালা বলা যেতে পারে। এটা বেশ ভিন্নরকম সৃজনশীল সুন্দর সলিউশন। তিনতলাটা সাধারণত নারিকেল,সুপারি, চাল, খজুরের গুড় ও নানা রকম সাংসারিক জিনিসপত্র রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়।আমাদের এলাকার ধান চাল ছাড়াও প্রধান বানিজ্যিক কৃষি পন্য হলো সুপারি আর নারিকেল।সংস্কৃতির মতো স্থানীয় কৃষি পন্য গননার/ মাপের এককও নগরের মাপের একক থেকে আলাদা। ১০টি সুপারিতে ১ ঘা, ২১ ঘা সুপারিতে হয় একা কুড়ি, তারমানে গতানুগতিক ২০ টি সুপারিতে এক কুড়ি না, ২১০টি সুপারিতে এক কুড়ি। চালের একক হলো কাঠি , ২৪ কে জি ২০০ গ্রামে ১ কাঠি চাল। একদা গমগম করা মানুষের ভিড়ে কেউ নিরবতা খুজলে এখানে এই তিনতলায় এসে সেটা খুব সুন্দর ভাবে খুজে পেতো।

দোতলার রেলিংয়ের নিচের মোটা বর্ডার পরবর্তীতে সংযোজন হয়েছে যা কাঠের রেলিংয়ের কারুকাজের নিচের দিকটা ঢেকে দিয়েছে ও দোতলার যে একটা সুন্দর ভাসমান আবহ ছিল তা খর্ব করেছে।

রজেন মাঝির মতো গ্রামীন নির্মাণ ঐতিহ্যের ধারক অনেক সুনিপুন ও সৃষ্টিশীল কাঠের কারিগর এদেশে ছিল এবং এখনো কিছু কিছু আছে। এরা শুধু কারিগরই নয় একই সাথে ডিজাইনার ও কাঠের স্ট্রাকচারাল বিষয়েরও সহজাত জ্ঞানের আধিকারী। আসলে সব রকমের কাঠের কাজেরই আমাদের হাজার বছরের নিজস্ব ঐতিহ্য আছে , বিশেষ করে কাঠের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে চট্টগ্রামের কারিগরদের সারা পৃথিবী ব্যাপী সুনাম ছিল। চট্টগ্রামে যে ঈশান মিস্ত্রি হাট (ইশাইন্যার হাট) আছে, এই ইশান মিস্ত্রি ছিলেন সেই সময়ের ইউরোপগামী কাঠের জাহাজের বিখ্যাত ডিজাইনার ও কারিগর । ইশান মিস্ত্রির নাম ইউরোপে সুপরিচিত ছিল । এই ইশান মিস্ত্রি বা এই রাজেন মিস্ত্রিরাই আমাদের গর্ব । ইউরোপীয় পরিব্রাজক সিজার ফ্রেডরিকের (১৫৬৭ সালে তিনি চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেন) লেখা থেকে জানা যায় পঞ্চদশ শতকে চট্টগ্রামে নির্মিত হতো ইউরোপে রপ্তানির জন্য বিশাল বিশাল বানিজ্যিক কাঠের জাহাজ। চতুর্দশ শতাব্দীতে চীনা নৌ-সেনাপতি জেং হি-র সমুদ্রযাত্রার সময়ে তার জাহাজ বিকল হয়ে পড়েলে তিনি চট্টগ্রামের বিশাল শিপইয়ার্ডে সেগুলো মেরামত করান বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের শাল গজারী, জারুল জাম, গর্জন ও অন্যান্য গাছের কর্ণফুলী নদীপথে পথে ‘ ষোলশহর ‘ শুলক বহর , বালামী পাড়া হয়ে পতেঙ্গা উপকূল পর্যন্ত অঞ্চলে গড়ে উঠেছিলো বিশাল কাঠের জাহাজ শিল্প এলাকা। সপ্তদশ শতকে তুরস্কের সুলতানের জন্য পূরো ফ্লিট (১৩টি যুদ্ধজাহাজের নৌবহর) তৈরি করেছিল চট্টগ্রামের কারিগররা। ১৮০৫ সালে ব্রিটিশদের ‘ট্রাফালগার’ যুদ্ধে চট্টগ্রামে নির্মিত কাঠের জাহাজ ব্যবহৃত হয়েছিল বলেও ইতিহাসে উল্লেখ আছে। এছাড়াও ইটালি ও জার্মানিতেও অনেক জাহাজ রপ্তানি হতো চট্টগ্রাম থেকে সেই পঞ্চদশ শতাব্দী থেকেই, অন্য দিকে চীন, জাপান, মালয় উপকূল, কোচিন, বোম্বাই, আকিয়াব, পেনাং, শীলংকা সহ এসব অঞ্চলেও চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ ঊন্নতমানের কাঠের জাহাজ নির্মাণশিল্পের জন্য সুপরিচিত ছিল।

একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখা যাবে যে গ্রামীন এই ধরনের ঘরবাড়িতে অবলীলায় উজ্জ্বল লাল রঙ, আকাশী-নীল বা গাঢ় সবুজ রং ঘরের বাইরে বড় পরিসরে ব্যবহার করছে ( আলোচ্য ঘরটিসহ অন্য আর একটি মধ্যম মানের গৃহস্থের ঘরের ছবিও এখানে দেয়া হয়েছে যেখানে নীল,সবুজ ও খয়রী লাল রঙ ব্যবহার করা হয়েছে নির্দ্বিধায় ) যা নগরের কোন স্থপতি করলে কথ্য ভাষায় আমরা তাকে ‘ ক্ষ্যাত ‘ বলতাম কেননা ‘ গ্লোবাল স্থাপত্য ‘ নামে এক অলীক রুচির মাত্রা একদম ছাত্রাবস্থায়ই আমাদের মস্তিস্কের গভীরে পুতে দেয়া হয়েছে। যেন এক অদৃশ্য বাজিকর নিউইয়র্ক, মিলান,লন্ডন বা টোকিওতে বসে আমাদের মনের মধ্যে ঠিক করে দিচ্ছে কোনটা রুচিসম্মত রং আর কোনটা রুচিসম্মত রং নয়, কোনটা সুন্দর ফর্ম আর কোনটা অসুন্দর ফর্ম…… সর্বোপরি কোনটা সঠিক শিল্পবোধ আর কোনটা সঠিক শিল্পবোধ নয়। আমরা যেন ঘোরগ্রস্ত শিল্পীর মতো সেই অদৃশ্য বাজিকরের নির্দেশ মতো চলছি আর চলছি। পোষা পাখি গৃহপালিত হবার ফল আস্তে আস্তে উড়তে ভুলে যায়…… আমার ভয় হয় আমরাও এই স্বভাবচ্যুত পোষা পাখির মতো কবে আবার স্বাধীনভাবে উড়তে ভুলে যাই অথবা অলরেডি বোধহয় উড়তে নাজানা গৃহপালিত পোষা পাখি হয়ে গেছি।

যা কিছু Greco-Roman-Judeo-Christian সভ্যতার অঙ্গ তা ই ‘ Global ‘ আর আমরা সহ তামাম বিশ্বের প্রাচীন প্রাচীন সব সভ্যতার যতসব সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ আছে তা সব তুচ্ছ ‘ Traditional বা Local ‘……. এ কারনেই বেটোফেন বা মোৎসার্ট বা বাখ ‘গ্লোবাল’ সভ্যতার অংশ আর তানসেন,আলাউদ্দিন, বিসমিল্লা খান বা পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরসিয়া এরা ‘ট্রাডিশনাল বা নিছক লোকাল ‘……. আর একটু সহজ করে ঘরোয়া ভাবে বলি , ভাপা পিঠা বা পাটিসাপটা পিঠা হলো ‘ ট্রাডিশনাল ‘ আর পিৎজা বা স্যান্ডুইচ হলো ‘ গ্লোবাল ‘। খৃস্টপূর্ব ৫ম শতকের অ্যাথেন্সবাসীদের পার্থেনন ‘ গ্লোবাল ‘ আর খৃস্টপূর্ব ৩য় শতকের পুন্ড্রনগরবাসীদের মহাস্থানগড় ‘ ট্রাডিশনাল ‘। পার্থেনন যেহেতু ‘ গ্লোবাল আর্কিটেকচার ‘ তাই আমাদের আর্কিটেকচার ডিগ্রি পেতে হলে পার্থেননের কোনকাঞ্চি, এর কলামের ব্যাস, উচ্চতা, এর আনুপাতিক হিসাব সব মুখস্ত করতে হবে, আর যেহেতু মহাস্থানগড় ‘ লোকাল বা ট্রাডিশনাল আর্কিটেকচার ‘ তাই ডিগ্রি পেতে এর নাম মোটেও না জানলেও চলবে। এই দর্শনের মোদ্দা কথা হলো যা কিছু গ্লোবাল তার সব কিছুই আমরা নির্দ্বিধায় অনুসরণ করে গ্লোবাল ভাবে গ্রহনযোগ্য হতে পারবো…….কেননা তাদের নব্য দর্শন অনুযায়ী সারা বিশ্ব হচ্ছে তথাকথিত একটা ‘ Global Village ‘ আর তারা হচ্ছে এই ‘ ভিলেজের ‘ চিরকালীন মাতুব্বর। সুতরাং স্থাপত্যেও এই মাতুব্বরদের ‘গ্লোবাল স্থাপত্য ও তার জ্যামিতি ‘ আমরা চোখ বুজে স্থান,কাল,জলবায়ু, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য,অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে অনুকরন ও অনুসরন করতে থাকবো। মনে রাখতে হবে সর্বক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্যই সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক আধিপত্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

অন্যদিকে এই বৈশ্বিক অদৃশ্য আধিপত্যের একই দেশে একই সমাজের মাঝে আছে সীমাহীন দৃশ্যমান চরম স্পষ্ট বিভাজন রেখা। নগরের অধিপতি শ্রেনীর সংস্কৃতি, দর্শন, শিল্পবোধ ও রুচির মাত্রাই সামাজিক মনস্তত্ত্বে ‘ আদর্শ নিয়ামক’ হিসেবে গন্য করা হবে এটাই যেন নিয়ম সেই সংস্কৃতি, দর্শন বা শিল্পবোধ যতই পরাশ্রয়ী, উন্মূল, প্রগতিবিরুদ্ধ বা জনবিচ্ছিন্নই হোক না কেন।এই শ্রেনীর বাইরে ৮৫% গ্রামীণ মানুষের যেন কোন সংস্কৃতি, দর্শন, শিল্পবোধ, চিন্তাচেতনার অস্তিত্ব থাকতে নেই…….তারা যেন এক ভূতুড়ে জনগোষ্ঠি……না, তারা তা নয়, তাদের অবশ্যই নিজস্ব শিল্পসাহিত্য, সংগীত,দর্শন,চিন্তাচেতনা ও নান্দনিকবোধ আছে……. তবে তা নিয়ে তারা প্রতাপের সাথে নাগরিক অভিজাত সমাজের সাথে প্রতিযোগিতায় নামে না…… নাগরিক দাপুটে সংস্কৃতির বাইরে থেকে খুব অলক্ষ্যে তারা তাদের সংস্কৃতির চর্চা নীরবে, নির্বিরোধী ভাবে করে যাচ্ছে……. আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি দুই দুইটা দেশে সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাবার পরেও রবীন্দ্রনাথ অপেক্ষা ৩০ কোটি বাংলাভাষীদের মধ্যে সম্পুর্ন প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতাহীন অনাথ ফকির লালন শাহের সাহিত্যের অনুরাগী রবীন্দ্রনাথের চেয়ে জনসংখ্যা বিচারে এখনো ৪/৫ গুন বেশি ( আমি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিরোধী না, বরং সে আমার প্রিয়তম কবি) । সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো লালনের লেখা পান্ডুলিপি কেউ কোনদিন বোধহয় চোখেও দেখেওনি কিন্তু তারপরও গ্রাম বাংলায় তার রচিত গান ছড়িয়ে পড়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখে মুখে সেই একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যা সময়ের সাথে সাথে বেড়েই চলেছে ……এ উদাহরনের মাধম্যে আমি স্থুলভাবে রবীন্দ্রনাথ ও লালনের সাহিত্য মানের তুলনা করতে চাচ্ছিনা বরং এর মাধ্যমে আমি দেখাতে চাচ্ছি যে আমাদের সমাজে অভিজাত নাগরিক শ্রেনী আর গ্রামীণ মানুষে দুই দুইটি শ্রেনীর মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজিত সাংস্কৃতিক ধারা চলে আসছে শত শত বছর ধরে আর জনসংখ্যার অনুপাতে এই দুই ধারার প্রতিনিধিত্ব যথাক্রমে প্রায় ১৫% আর ৮৫%, কিন্তু তার পরও নগরের এই ১৫% অধিপতি শ্রেনীই ঠিক করে দিচ্ছে কোনাটা সু-শিল্পবোধ বা উন্নত রুচি আর কোনটা কু-শিল্পবোধ বা অনুন্নত রুচি , এখানে এই ৮৫% মানুষের কোন অংশগ্রহন বা প্রতিনিধিত্ব নাই। এটা কোন সুস্থ সমাজের পরিসংখ্যান হতে পারে না। পৃথিবীর আর কোন সমাজে নাগরিক ও গ্রামীণ সংস্কৃতি ও রুচিবোধের মধ্যে এমন সুতীব্র বিভাজন ও দূরত্ব আছে কিনা আমার জানা নাই…… আমি মনে করি এটা একটা চরম অসুস্থ সমাজের স্পষ্ট সিমটম……সিমটম যদি এতো স্পষ্ট হয় তা হলে রোগ নিশ্চয়ই আরো অনেক ভয়ানক। এব্যাপারে বিস্তর মৌলিক চিন্তাভাবনা ও গবেষোনা দরকার। গ্রামীন মৌলিক এই শিল্পবোধ বা শিল্পচেতনা (স্থপত্যও যার একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ) আমাদের সন্মানের সাথে বিবচনায় নিয়ে একটা বিশাল পরিসরের সিনথেসিসের চিন্তাভাবনার আশু প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

সবচেয়ে মজার কথা হলো এই ভীনদেশী ‘ বাজিকরের ‘ প্রখর প্রভাব থেকে কিন্তু রাজেন মাঝির মনন, শিল্পবোধ ও রুচিরমাত্রা প্রায় সম্পুর্ন মুক্ত ও স্বাধীন ( ‘ প্রায় ‘ বলছি একারনে যে আমাদের ফার্নিচার কার্পেন্ট্রিতে বৃটিশ শাসনামলে অনেক নতুন টেকনিক যুক্ত হয়েছে )। রাজেন মাঝি বলতে আমি শুধু ব্যক্তি রাজেনকে বুঝাচ্ছিনা বরং সমগ্র গ্রামীন জনপদের ‘ পলিমাটির সৌরভের ‘ মধ্যে থেকে হাজার বছরের রক্তধারার মধ্যে সরাসরি বেড়ে ওঠা একান্ত নিজস্ব নান্দনিক ও শিল্পবোধকে বোঝাচ্ছিঃ

আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল।
তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন
অরণ্য এবং শ্বাপদের বথা বলতেন
পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।
তিনি মৃত্তিকার গভীরে
কর্ষণের কথা বলতেন
অবগাহিত ক্ষেত্রে
পরিচ্ছন্ন বীজ বপনের কথা বলতেন
সবত্সা গাভীর মত
দুগ্ধবতী শস্যের পরিচর্যার কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

( এই বিখ্যাত কবিতার কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ জন্ম আমাদের দক্ষিনাঞ্চলের প্রায়ই একই জনপদের বাবুগঞ্জের বাহেরচরে, আমাদের এলাকা থেকে বেশি দূরে নয়, ওনার গ্রাম ক্ষুদ্রকাঠি আর আমার গ্রামের নাম উদয়কাঠি)

লিখতে লিখতে অন্য দিকে চলে গেলাম, অনেকে আবার বিরক্ত হতে পারে……যা ই হোক, আবার এই নির্দিষ্ট ঘরের বর্তমান অবস্থার কথা বলি। এ ঘরের সন্তানেরা যেহেতু সবাই জাতীয় ভাবে প্রতিষ্ঠিত তাই ৪ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানদের মধ্যে কেউই এখন এখানে থাকে না। পুত্রদের দুই জন ৭/৮ কিলোমিটার দূরে পিরোজপুর শহরে থাকে বাকি পুত্রেরা ঢাকায় থাকে, বংশধরদের কেউ কেউ উত্তম আমেরিকায় থাকে। পিরোজপুরের দুইজন মাঝে মাঝে দিনের বেলায় বাড়িতে আসে, কিন্তু প্রধানত এই সম্ভ্রান্ত ঘরটি এখন একটি কেয়ারটেকারের পারিবারিক বাসস্থান বলা যায়। এটাই আমাদের দেশের বর্তমান সময়ের গ্রামীন সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত পরিবার সমূহের গতানুগতিক ইতিহাসের সর্বশেষ পরিস্থতি। পদ্মা ব্রিজ হয়ে গেলে যখন ৪ ঘন্টার মধ্যে ঢাকা থেকে আসা যাবে তখন হয়তো দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে, হয়তো তখন ঘরটি ইংল্যান্ডের ‘ কান্ট্রি হাউস ‘ আদলে নতুন নাগরিক বংশধরদের সাপ্তাহিক বা মাসিক বা উৎসবকেন্দ্রিক আগমন ও জমায়েতে নতুনভাবে মুখরিত হয়ে উঠতে পারে ,হয়তো এর মাধ্যমে গ্রাম ও নগরের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্কের নতুন কোন শেকড় সন্ধানী কেমেস্ট্রি জন্ম নিতে পারে।

আমাদের সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাসের বর্তমান পর্যায়ে প্রায় ফাঁকা এই ঘরটির দিকে তাকালে চার্লস ডিকেন্সের সেই বিখ্যাত উক্তিটি অন্য ভাবে মিলে যায়…..
‘ নগরের এক প্রান্তে প্রচুর খাদ্য কিন্তু কোনো ক্ষুধা নেই, অন্য প্রান্তে প্রচুর ক্ষুধা কিন্তু কোনো খাদ্য নেই। ’
……..গ্রামের এক প্রান্তে বিশাল বাড়ি কিন্তু থাকার মানুষ নাই, অন্য প্রান্তে বিপুল প্রায় আশ্রয়হীন মানুষ কিন্তু তাদের কোন সঠিক আশ্রয় নেই।

— — —-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *