কি থাকছে নতুন ড্যাপ (DAP)-এ

কি থাকছে নতুন ড্যাপ (DAP)-এ

Source: Somokal

বেশ কিছু চমকপ্রদ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে রাজধানীর ভূমি ব্যবহারের রূপরেখা ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) চূড়ান্ত করেছে কারিগরি কমিটি। এতে আবাসিক ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত প্লটের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ জমি উন্মুক্ত রেখে বাকি অংশে ভবন তৈরির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ওই উন্মুক্ত জমিও নগরবাসীর কল্যাণে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। উন্মুক্ত স্থান বা মাঠের নিচে কৃত্রিম জলাধার নির্মাণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ছোট ছোট জমিকে একটি ব্লকে পরিণত করে সেখানে ভবন নির্মাণে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চতায় ছাড় দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ১ শতাংশ জমিতেও ভবনের নকশা অনুমোদনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ রকম বেশ কিছু বিষয়কে যুক্ত করে চূড়ান্ত করা হয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার ভূমি ব্যবহারের রূপরেখা। ড্যাপ প্রণয়নে গঠিত কারিগরি কমিটি এ চূড়ান্ত পরিকল্পনা নিয়ে আরেকটি জাতীয় সেমিনারের আয়োজন করবে। সেখানে নতুন কোনো পরামর্শ এলে কিছু সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে। এর পর স্টিয়ারিং কমিটির কাছে পেশ করা হবে। কমিটি গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবে। সব মিলিয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হতে পারে ড্যাপ প্রণয়নের সম্পূর্ণ কার্যক্রম।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম জানান, সংশোধিত ড্যাপ নিয়ে তারা কয়েক বছর ধরে কাজ করছেন। সর্বশেষ চূড়ান্ত করার আগে খসড়া ড্যাপ নিয়ে ব্যাপক পর্যায়ে গণশুনানি করা হয়। এর পর আরও কিছু বিষয় সংযুক্ত করা হয়। সম্প্রতি ড্যাপ রিভিউ কমিটির সভায় ড্যাপের সারাংশ উপস্থাপন করা হয়। সভায় উপস্থিত সবাই সংশোধিত ড্যাপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

ড্যাপ রিভিউ কমিটির আহ্বায়ক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম এমপি জানান, নাগরিক সুবিধা নেই অথচ সেখানে অতীতে ১৫-২০ তলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ওই ভবন থেকে রাস্তায় বের হলেই যানজট তৈরি হয়। আবার একই ভবনে বহু বাসিন্দা থাকায় যে পরিমাণ পানি সরবরাহ প্রয়োজন, পাশে ওয়াসার পাইপলাইন ততটা ব্যাসের নয়। জলাবদ্ধতাও তৈরি হয়। এবার নাগরিক সুবিধার বিষয়গুলো নিশ্চিত করে ভবনের উচ্চতা নির্ধারিত হবে। সংশোধিত ড্যাপের মূল লক্ষ্য নাগরিকবান্ধব ও পরিকল্পিত নগর উপহার দেওয়া।

৪০ শতাংশ জমি না ছাড়লে বহুতল ভবন নয়:

ড্যাপ প্রণয়ন কমিটি মনে করে, রাজধানীর যত্রতত্র বহুতল ভবন গড়ে উঠলেও ওই ভবনের বাসিন্দাদের জন্য যে পরিমাণ নাগরিক সুবিধা থাকা প্রয়োজন, সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেই। এ অবস্থার নিরসনে আবাসিক বহুতল ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। রাজউক জরিপ চালিয়ে দেখতে পেয়েছে, রাজধানীর ৯৯ শতাংশের বেশি ভবন আট তলার নিচে। আর আবাসিক ভবনের মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভবনই আটতলার নিচে। গুলশান-বনানী এলাকায় সর্বোচ্চ সংখ্যক বহুতল ভবন থাকলেও মোট সংখ্যার তুলনায় অনেক কম। ৮ হাজার ৩৩৯টি ভবনের মধ্যে আটতলা আছে ৬৪টি। ৯ তলা ৭৪টি। ১৬ ও ২২ তলা আছে ২টি করে। এ জন্যই ড্যাপে আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে এলাকাভেদে ৬ থেকে ৮ তলা উচ্চতা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য রাস্তার প্রশস্ততা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তি বিবেচনায় কিছু শিথিলতা রাখা হয়েছে। আর বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ রাখা হয়নি।ড্যাপ প্রণয়ন কমিটির ডেপুটি টিম লিডার খন্দকার নিয়াজ রহমান বলেন, যেসব ভবন এর চেয়ে বেশি উঠে গেছে, সেগুলো থাকবে। ভবিষ্যতে ওইসব ভবন আয়ুস্কাল হারালে তখন নতুন নিয়মে ভবন তৈরি করতে হবে। এটা করার মূল উদ্দেশ্য রাজধানীর জনঘনত্ব কমানো। এ জন্য এখন ভবনগুলোতে ফ্ল্যাটের সংখ্যায়ও নিয়ন্ত্রণ আনা হবে।

ব্লক তৈরি করলে বাড়তি সুবিধা:

জানা যায়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিকে একত্র করে ব্লক তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে ড্যাপে নূ্যনতম ব্লকের আয়তন ছিল ৪০ কাঠা। এবার সর্বনিম্ন ১০ কাঠা জমি নিয়ে একটি ব্লক তৈরির সুযোগ রাখা হয়েছে। ড্যাপ প্রণয়নকারীরা মনে করেন, এতে পুরান ঢাকা ও রাজধানীর ঘিঞ্জি এলাকাগুলোকে অপেক্ষাকৃত পরিকল্পিতভাবে সাজানো যাবে। কারণ রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক মানুষ আছে যাদের জমির পরিমাণ ১ থেকে ৪ শতাংশ। তারা সেখানে পরিকল্পিত কোনো কিছু তৈরি করতে পারছে না। ওইসব এলাকায় প্রশস্ত রাস্তা না থাকায় রাজউকও এত দিন ছোট ছোট জমিতে নকশার অনুমোদন দেয়নি। সেগুলোকে একত্র করে ব্লকে পরিণত করলে বহুতল ভবনের নকশার অনুমোদন মিলবে। পাশাপাশি সেখানকার রাস্তাও প্রশস্ত করা যাবে। আর ব্লকগুলোর ক্ষেত্রে ভবনগুলোর উচ্চতার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে।

মিলেমিশে থাকবে আবাসিক-বাণিজ্যিক ও শিল্প ভবন:

অতীতে রাজধানীর কয়েকটি এলাকাকে শিল্প-বাণিজ্যিক-আবাসিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবে রূপ পায়নি। এক সময় ধানমন্ডি, গুলশান-বনানী, উত্তরাকে পরিকল্পিত আবাসিক; তেজগাঁওকে শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা করা যায়নি। প্রতিটি এলাকার জমির মিশ্র ব্যবহার করা হয়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমসহ মিশ্র ব্যবহার চলছে। এসব মিশ্র এলাকাকে আবাসিক হিসেবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আবার মিশ্র এলাকা হলে নাগরিকদেরও অনেক সুবিধা হয়। উন্নত বিশ্বও এখন মিশ্র এলাকাকে প্রাধান্য দিয়ে নগর পরিকল্পনা করছে। এ জন্য রাজউক মিশ্র এলাকাকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা করেছে সংশোধিত ড্যাপে।

পার্কিং না রেখেও হবে বহুতল আবাসিক ভবন:

এতদিন যে কোনো আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদন করতে হলেই ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী বা নিচতলায় পার্কিং স্পেস থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। এখন থেকে এটা আর থাকছে না। পরিবর্তে এলাকাভিত্তিক পার্কিং জোন গড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে নতুন জনগোষ্ঠীর আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।

রাস্তার প্রশস্ততা হবে সর্বনিম্ন ৬ ফুট:

এবার ড্যাপে রাস্তার প্রশস্ততা সর্বনিম্ন ৬ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। তাহলে অতি ক্ষুদ্র জমিতেও নকশার অনুমোদন দেবে রাজউক। এত দিন ২০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা নিশ্চিত না করলে সেখানে নকশা অনুমোদনে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ ছিল। আর ৮ ফুটের কম রাস্তা থাকলে সেখানে কোনো নকশারই অনুমোদন দেওয়া হতো না। এবার বলা হয়েছে, ৬ ফুট রাস্তা থাকলেই ভবনের নকশার অনুমোদন দেওয়া যাবে। সে ক্ষেত্রে ১ থেকে ৩ শতাংশের প্লটের একজন মালিকও এক থেকে তিন তলা পর্যন্ত ভবন তুলতে পারবেন।

বন্যাপ্রবাহ এলাকায় চলাচলের জন্য এক্সপ্রেসওয়ে:

এত দিন ড্যাপে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে রাস্তা তৈরির সুযোগ ছিল। এবার সেটা বন্ধ করে সেখানে এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে বা ফ্লাইওভার তৈরির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ড্যাপের আওতাধীন যেসব এলাকায় এ ধরনের রাস্তা তৈরি হয়েছে, সেগুলো অপসারণ করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে আশুলিয়া ও সাভারের বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে যে ৩ কিলোমিটার সড়ক তৈরি করা হয়েছে, তা অপসারণ করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করতে বলা হয়েছে।

কালভার্ট-বক্স কালভার্ট তুলে নৌপথ:

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খাল ভরাট করে কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট তৈরির কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এ জন্য সব কালভার্ট ও বক্স কালভার্ট তুলে দিয়ে সেখানে নাব্য ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এটা করা গেলে ড্যাপ এলাকায় ৫৬৬ কিলোমিটার নতুন নৌপথ সৃষ্টি হবে। এসব নৌপথে যাতায়াত ব্যবস্থা চালু করলে রাজধানীর যানজট ও জলাবদ্ধতারও নিরসন হবে। এ ছাড়া যানজট নিরসনে ২ হাজার ৭৪৮ কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরির কথা বলা হয়েছে।

প্রতি ওয়ার্ডে স্কুল ও হাসপাতাল:

বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য পছন্দমতো স্কুল পাওয়া ও শিক্ষা ব্যয় নির্বাহ করা নগরবাসীর জন্য অনেক কঠিন। এ অবস্থার অবসানে ড্যাপ এলাকায় ৬২৭টি স্থানে সরকারি বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ থাকবে। এতে সন্তানের শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা দূর হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে এ রকম ৩ থেকে ৪টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রতিটি স্কুলের সঙ্গে থাকবে খেলার মাঠ। পরিবারের কারও ছোটখাটো অসুখ হলেই বড় হাসপাতাল বা প্রাইভেট ডাক্তারের চেম্বারে ছুটতে না হয়, সে জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি ৫০ শয্যার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের প্রস্তাব করা হয়েছে।

উন্মুক্ত স্থানের নিচে জলাধার:

নতুন জলাধার তৈরির জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় উন্মুক্ত স্থান ও খেলার মাঠগুলোকে ১০ ফুট গভীরতায় খুঁড়ে নিচে পাথর-বালু দিয়ে একটি জলাধার তৈরির কথা বলা হয়েছে। এর ওপরে থাকবে স্বাভাবিক খেলার মাঠ বা পার্ক-উদ্যান। বৃষ্টি হলেই সেসপিটের মাধ্যমে পানি ওই জলাধারে ঢুকে পড়বে। এ রকম ৭৫টি জলাধার তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।

ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ড্যাপে আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো আগে ছিল না। যেমন বালু নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়েছে। বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলের জমির মালিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগে ড্যাপ প্রণয়নের সময় হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে করা হয়নি। এবার হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভের ওপর নির্ভর করে ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে।

চূড়ান্ত ড্যাপ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এই ড্যাপে হাঁটাপথ, নতুন রাস্তা, জলাধার বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বাসযোগ্য করার মতো কিছু ভালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভূমির মিশ্র ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এটা করলে হিতে বিপরীত হয় কিনা, সেই শঙ্কাও থাকছে। যানজট নিরসনেরও কিছু কথা আছে। নগর সরকারের কথাও আছে। কিন্তু প্রস্তাবনাগুলো কেবল কাগজে থাকলে হবে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থের সংযোগও দরকার। এ জন্য সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক নগর পরিকল্পনাবিদ আকতার মাহমুদ বলেন, মিশ্র ব্যবহারটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে- এতে ভূমি ব্যবহারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে কিনা। কত শতাংশ মিশ্র ব্যবহার করা যাবে আর কতটা করা যাবে না, তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। সেটা যেন গণহারে মিশ্র না হয়ে যায়। এমন কোনো কিছু করা যাবে না, যা আমাদের পরিবেশকে নষ্ট করে ফেলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *